১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালির রক্তলব্ধ এক অবিনাশী দর্শনের নাম। যে রক্ত সুরমা-কুশিয়ারা ও কালনী নদীর স্রোতের মতো মিশে আছে এ দেশের মাটির গভীরে, তা আজ বিশ্বময় স্বীকৃত ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’।
সুনামগঞ্জ জেলার ভাটি বাংলার মানুষের কাছে একুশের এই চেতনা কেবল একটি স্মারক দিবস নয়, বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এবং নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরার চিরন্তন প্রেরণা। আজ এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের ভাবতে হবে—বায়ান্নর সেই তেজ কি আজও আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে বহমান, নাকি তা কেবল আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে ম্লান হয়ে যাচ্ছে?
সুনামগঞ্জ ঐতিহাসিকভাবেই সংস্কৃতির এক উর্বর চারণভূমি। মরমী সাধক হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত, বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম এবং দুর্বিন শাহের এই জনপদ মূলত ভাষারই জয়গান গেয়ে এসেছে চিরকাল। তাঁদের গান ও দর্শনে যে গণমানুষের মুক্তির সুর বেজেছিল, তা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মূল সুরেরই এক সাংস্কৃতিক বহিঃপ্রকাশ। এই জেলার প্রতিটি ধূলিকণা সাক্ষী দেয় যে, হাওরপাড়ের মানুষ যেমন প্রকৃতির রুদ্ররূপের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকে, তেমনি তারা নিজের ভাষা ও স্বকীয়তা রক্ষায় কোনো আপস করতে জানে না। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, বর্তমানের এই যান্ত্রিক ও বিশ্বায়নের যুগে আমরা কি সেই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে যথাযোগ্য মর্যাদায় লালন করতে পারছি?
আজকের বাস্তবতায় দেখা যায়, একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলেও শহীদ মিনারে ফুলের স্তূপ জমে। কিন্তু বছরজুড়ে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভাষার মর্যাদা রক্ষায় কী ভূমিকা রাখা হচ্ছে?
সুনামগঞ্জের নতুন প্রজন্মের মাঝে প্রমিত বাংলা চর্চার পরিবর্তে এক ধরণের জগাখিচুড়ি ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটছে, যা উদ্বেগজনক। জেলার অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি থাকলেও তা পাঠকশূন্য। একুশের চেতনাকে ধারণ করার জন্য যে বইপড়া ও মননশীল চর্চা প্রয়োজন, তা ক্রমান্বয়ে স্তিমিত হয়ে আসছে।আকাশ সংস্কৃতি ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় আমাদের তরুণ সমাজ নিজস্ব লোকজ গান ও সাহিত্যের চেয়ে ভিনদেশি বিকৃত সংস্কৃতির দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে।
একুশের চেতনাকে কেবল ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে প্রাত্যহিক জীবনের অংশ করতে হবে। সুনামগঞ্জ জেলা নিয়ে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জের প্রতিটি ইউনিয়ন ও গ্রামে ভ্রাম্যমাণ বা স্থায়ী পাঠাগার স্থাপন করতে হবে, যেখানে শুদ্ধ বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি লোকজ ইতিহাসের চর্চা থাকবে।স্কুল-কলেজগুলোতে নিয়মিত বিতর্ক প্রতিযোগিতা, আবৃত্তি এবং শুদ্ধ উচ্চারণ কর্মশালার আয়োজন করা জরুরি। স্থানীয় লেখক, গবেষক ও বাউলদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে, যাঁরা একুশের চেতনাকে তাঁদের সৃষ্টিতে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কেবল একদিনের উৎসব নয়, সারা বছর শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার দায়িত্ব নিতে হবে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ নাগরিক উভয়কেই।
একুশ আমাদের শিখিয়েছে ‘মাথা নত না করা’। সুনামগঞ্জের আকাশ-বাতাস আজ সেই দৃপ্ত শপথের প্রতিধ্বনি করছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ভাষা যদি হারিয়ে যায় তবে জাতি হিসেবে আমাদের কোনো পরিচয় থাকবে না। হাওরের পানির মতো স্বচ্ছ হোক আমাদের ভাষাপ্রেম, আর পাহাড়ের মতো অটল হোক আমাদের দেশপ্রেম।
শহীদ দিবসের এই পুণ্যলগ্নে আমাদের দাবি—সর্বস্তরে বাংলার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত হোক এবং সুনামগঞ্জের কৃষ্টি-কালচার বিশ্বের দরবারে সগৌরবে উদ্ভাসিত হোক। ভাষাশহীদদের প্রতি জানাই আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।