গাজীপুরের জয়দেবপুরে ১৩ বছর বয়সী কিশোর আঃ রাহিমকে হত্যা করে গভীর শালবনের ভেতর গর্তে মাটি চাপা দেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ।
এ ঘটনায় রাহিমের বড় ভাই মোঃ আলামিন হোসেন (২৩) ও তাঁর বন্ধু আশিক আহমেদ (২০)–কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আঃ রাহিম (১৩) গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর থানার ডগরী নয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম ও রোজিনা আক্তারের ছেলে। তিনি স্থানীয় নয়াপাড়া এবাদিয়া দাখিল মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন।
গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ছয়টার পর থেকে রাহিম নিখোঁজ হন। পরিবারের সদস্যরা আশপাশের বাড়ি, আত্মীয়স্বজনের বাসা ও সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর সন্ধান পাননি। পরে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে রাহিমের বাবা জয়দেবপুর থানায় জিডি নম্বর-১২৫ মূলে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
এর মধ্যে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ দুপুর আনুমানিক ১টা ১৫ মিনিটের সময় জয়দেবপুর থানাধীন বিকেবাড়ি পদ্মপাড়া এলাকায় বাঁশরী রিসোর্টের দক্ষিণ পাশে বিটিআই গ্রুপের বাউন্ডারি ওয়ালের পশ্চিম পার্শ্বে সরকারি শালবনের ভেতরে একটি গর্ত থেকে অজ্ঞাতনামা ১৩/১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরে শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে উপস্থিত হয়ে রাহিমের বাবা মরদেহের পরিহিত পোশাক দেখে ছেলেকে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় রাহিমের বাবা নুরুল ইসলামের অভিযোগের ভিত্তিতে জয়দেবপুর থানায় মামলা নম্বর-২৭, তারিখ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় মামলা রুজু করা হয়। মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় এসআই (নিরস্ত্র) মোঃ মোজাম্মেল হককে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপারের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় বিশ্বস্ত গোপন সূত্র ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করা হয় এবং তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। পরে জয়দেবপুর থানার একটি বিশেষ টিম গত ৩ মার্চ ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে জয়দেবপুর থানাধীন মির্জাপুর এলাকা থেকে সন্দেহভাজন আসামি মোঃ আলামিন হোসেন পিতা: নুরুল ইসলাম সাং- ডগরী নয়াপাড়া, থানা- জয়দেবপুর, জেলা- গাজীপুর, এবং আশিক আহমেদ (পিতা: কাজী নজরুল ইসলাম, সাং- ডগরী খাসপাড়া, থানা- জয়দেবপুর, জেলা- গাজীপুর)–কে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়। সেখানে তাঁরা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা স্বীকার করেন—রাহিম তাঁর বাবার কাছে মোবাইল ফোন কিনে দেওয়ার জন্য বায়না ধরতেন এবং এ নিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করতেন। বিষয়টি বড় ভাই আলামিন হোসেনের নজরে আসে। ছোট ভাইকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে আলামিন তাঁর বন্ধু আশিক ও সুমনের সঙ্গে পরিকল্পনা করেন।
গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে তাঁরা রাহিমকে জয়দেবপুর থানাধীন বিকেবাড়ি পদ্মপাড়া এলাকার বাঁশরী রিসোর্টের দক্ষিণ পাশে বিটিআই গ্রুপের বাউন্ডারি ওয়ালের পশ্চিম পার্শ্বে সরকারি গভীর শালবনের ভেতরে নিয়ে যান। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাহিমকে একটি গজারী গাছের সঙ্গে মাফলার দিয়ে বেঁধে তাঁর মুখে স্কচটেপ পেঁচিয়ে দেওয়া হয়।
একপর্যায়ে আলামিন রাহিমকে চর-থাপ্পড় মারেন এবং মুখের স্কচটেপ খুলে দেন। তখন রাহিম পুরো ঘটনা বাবাকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বললে আলামিন ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে তিনি রাহিমকে মাটিতে ফেলে গলা টিপে হত্যা করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।
ঘটনার পর আলামিন অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে ঘটনাস্থলের পাশেই একটি গর্ত খুঁড়ে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে মাটি চাপা দেন। পরিচয় গোপন করতে রাহিমের গায়ের জ্যাকেট বড়চালা এলাকার তিন রাস্তার মোড়ে নিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয় বলেও পুলিশ জানায়।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত অন্যান্য আসামি বা সহযোগীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নির্মম এ হত্যাকাণ্ডে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন।