অক্টোবর মাস বিশ্বব্যাপী স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস হিসেবে পালন করা হয়। এটি শুধুমাত্র নারীদের রোগ নয়, পুরুষরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। সমাজে এখনো এ বিষয়ে কুসংস্কার, লজ্জা ও অজ্ঞতা বিরাজ করছে। ফলে রোগীরা দেরিতে চিকিৎসা শুরু করেন এবং প্রাণহানির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ক্যান্সারকে বলা হয় কালান্তর ব্যাধি। এটি যুদ্ধ, দুর্যোগ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে, তবে পার্থক্য হলো—দুর্যোগ কিছু সময় পরে থেমে যায়, কিন্তু ক্যান্সার প্রতিনিয়ত জীবন কেড়ে নিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুসারে, স্তন ক্যান্সার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং সময়মতো সচেতনতা না থাকলে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে।
স্তন ক্যান্সার কি
স্তন ক্যান্সার হল একটি মারাত্মক রোগ, যেখানে স্তনের কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। সাধারণত কোষগুলো নিয়মিতভাবে বিভাজিত হয় এবং পুরনো কোষগুলো মারা যায়। কিন্তু যখন এই নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন কোষগুলো দ্রুত বিভাজিত হয়ে টিউমার বা গাঁটের সৃষ্টি করে।
প্রাথমিক পর্যায়ে টিউমার শুধুমাত্র স্থানীয় থাকতে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি রক্ত বা লিম্ফের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদিও নারীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়, পুরুষরাও আক্রান্ত হতে পারে। অতি সচেতনতা এবং নিয়মিত পরীক্ষা করলে জীবন রক্ষার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
স্তন ক্যান্সারের প্রকারভেদ
১. ডাকটাল কার্সিনোমা ইন সিচু (DCIS) – প্রাথমিক স্তরের ক্যান্সার, যা শুধুমাত্র স্তনের ডাক্টে থাকে এবং অন্যান্য অংশে ছড়ায় না। সময়মতো শনাক্ত করলে সম্পূর্ণরূপে নিরাময় সম্ভব।
২. ইনভেসিভ ডাকটাল কার্সিনোমা (IDC) – সবচেয়ে সাধারণ ধরনের স্তন ক্যান্সার। এটি ডাক্টের বাইরে ছড়িয়ে অন্যান্য অংশে প্রবেশ করতে পারে এবং অন্যান্য অঙ্গেও মেটাস্টেসিস ঘটাতে পারে।
৩. লোবুলার কার্সিনোমা ইন সিচু (LCIS) – লোবুলের কোষে দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে আক্রমণাত্মক নয়, তবে ভবিষ্যতে ইনভেসিভ ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।
৪. ইনভেসিভ লোবুলার কার্সিনোমা (ILC) – লোবুলের কোষে বৃদ্ধি পায় এবং ধীরে ধীরে অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
৫. ট্রিপল নেগেটিভ স্তন ক্যান্সার – এই ধরনের ক্যান্সারের কোষে তিনটি হরমোনের রিসেপ্টর নেই (ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন, HER2)। এটি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং চিকিৎসায় চ্যালেঞ্জিং।
৬. হের২-পজিটিভ স্তন ক্যান্সার – এই ধরনের ক্যান্সারের কোষে HER2 প্রোটিনের উচ্চ মাত্রা থাকে। এটি তুলনামূলকভাবে আক্রমণাত্মক হলেও নির্দিষ্ট ওষুধে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। স্তন ক্যান্সার সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা করলে জীবন রক্ষার সম্ভাবনা অনেক বেশি। নিয়মিত চেকআপ, সেলফ এক্সাম এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্তন ক্যান্সারের উৎপত্তি
স্তনের দুধবাহী নালী বা গ্রন্থির কোষ যখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে শুরু করে, তখন ক্যান্সার তৈরি হয়। প্রথমে ছোট গুটি বা চাকা দেখা যায়, পরে ধীরে ধীরে বড় হয় এবং বগল বা শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো ব্যথা বা দৃশ্যমান লক্ষণ থাকে না, তাই সচেতনতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
লক্ষণ
স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক ও প্রগতিশীল লক্ষণগুলো হলো:
১ . স্তনে গুটি বা চাকা অনুভব হওয়া – স্পর্শে দৃঢ়, অনিয়মিত। ২ . পুরো স্তনে অস্বাভাবিক ফোলাভাব বা আকার পরিবর্তন। ৩. ত্বকে জ্বালা, লালচে ভাব, ডিম্পলিং বা কমলার খোসার মতো চেহারা। ৪ . স্তনবৃন্ত ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া বা আকৃতি পরিবর্তন। ৫ . স্তনবৃন্ত থেকে দুধ ব্যতীত অন্য তরল বা রক্ত নিঃসরণ। ৬ . স্থায়ী ব্যথা বা অস্বাভাবিক টান। ৭. স্তনের ত্বকে গরম ভাব বা প্রদাহ। ৮. স্তনের ওপরিভাগ বা পাশে গিঞ্জি বা গুটি ধরা। ৯. আকারে হঠাৎ পরিবর্তন বা কোনো অংশে সাপের মতো টান অনুভূত হওয়া। ১০. হাত বা বাহুর নীচে লিম্ফ নোড ফোলা বা টান। সচেতন হয়ে সময়মতো ডাক্তার দেখালে চিকিৎসা সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
ঝুঁকির কারণ
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে ঝুঁকি বৃদ্ধি।
পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস (মা, বোন, খালা, ফুপু)।
দেরিতে বিয়ে বা সন্তান না নেওয়া।
স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজন।
দীর্ঘদিন জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন।
মেনোপজের পর হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি।
মদ্যপান, অতিরিক্ত লাল মাংস খাওয়া।
পূর্বে এক স্তনে ক্যান্সার হলে অন্য স্তনেও ঝুঁকি।
বাচ্চাকে বুকের দুধ না খাওয়ানো।
ঝুঁকি কমানোর উপায়
সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন, ৩০ মিনিট হালকা ব্যায়াম।
স্বাভাবিক ওজন বজায় রাখা।
৩০ বছরের মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়া।
শিশুকে অন্তত দুই বছর বুকের দুধ খাওয়ানো।
শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া।
মাংস ও চর্বিজাতীয় খাবার কম খাওয়া।তাই নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা এবং পুষ্টিকর খাদ্য স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
স্তন ক্যান্সার শনাক্তকরণ
নিজে নিজে পরীক্ষা (BSE): মাসিক শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে স্তন পরীক্ষা।
ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন (CBE): চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা করে লক্ষণ শনাক্ত।
ম্যামোগ্রাফি: এক্স-রে দ্বারা স্তনের ছবি তোলা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্ত করা যায়।
নিয়মিত পরীক্ষা ও সতর্কতা জীবন রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিসংখ্যান
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৩,০০০ নারী নতুন করে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।
প্রতিবছর মৃতের সংখ্যা প্রায় ৬,৭৮৩ জন নারী।
দেশের স্তন ক্যান্সারের রোগীর মধ্যে প্রায় ৯৮% নারী এবং ২% পুরুষ।
নারী-পুরুষ মিলিয়ে মোট ক্যান্সার রোগীর মধ্যে ৮.৩% স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত।
বৈশ্বিকভাবে প্রতি ৮ জনে ১ জন নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।
স্তন ক্যান্সারের জটিলতা
শারীরিক: শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়া (মেটাস্টাসিস), ক্রমাগত ব্যথা ও অক্ষমতা।
মানসিক: হতাশা, ভয়, আত্মবিশ্বাস হারানো, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।
অর্থনৈতিক: ব্যয়বহুল চিকিৎসা, পরিবারে আর্থিক চাপ।
সামাজিক: কর্মক্ষমতা হারানো, পরিবার ও সমাজে অবস্থান ব্যাহত।
স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা পদ্ধতি
এলোপ্যাথি চিকিৎসা:
শল্যচিকিৎসা (সার্জারি): টিউমার অপসারণ, প্রাথমিক পর্যায়ে লাম্পেক্টমি বা সম্পূর্ণ স্তন অপসারণ।
কেমোথেরাপি: ওষুধের মাধ্যমে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস।
রেডিয়েশন থেরাপি: উচ্চ শক্তির রশ্মি ব্যবহার করে টিউমার ধ্বংস।
হরমোন থেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপি: HER2 বা হরমোন রিসেপ্টর পজিটিভ ক্যান্সারের জন্য বিশেষ ওষুধ, যেমন ট্রাস্টুজুম্যাব, ট্যামোক্সিফেন।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতি
স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে চিকিৎসা সহজ ও কার্যকর হয়। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার আক্রান্ত টিস্যুকে লক্ষ্য করে ব্যক্তিগত ঔষুধ নির্বাচন করে। সঠিক রোগ নির্ণয় এবং ঔষুধ প্রয়োগ করলে প্রাথমিক স্তরে স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া যায়। তবে সময়মতো চিকিৎসা না নিলে রোগ জটিল হয়ে জীবন-হুমকিস্বরূপ হতে পারে।
একুশ শতকের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় ঔষুধের গুণগত মান উন্নত হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ রোগীর শরীর, ইতিহাস ও লক্ষণ অনুযায়ী ঔষুধ নির্ধারণ করেন। সঠিক চিকিৎসা গ্রহণে স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক আরোগ্য সম্ভব।
অভিজ্ঞ চিকিৎসকগণ প্রাথমিকভাবে যে ঔষুধগুলি নির্বাচন করেন, সেগুলি হলো:
কার্সিনোসিন, কনিয়াম ম্যাকুলাটাম, ফাইটোলাকা ডেকানড্রা, সিলিসিয়া, ক্যালসারিয়া কার্বোনিকা, থুজা অক্সিডেন্টালিস, ল্যাচেসিস মিউটাস, হাইড্রাস্টিস কানাডেনসিস, আয়োডিয়াম, ফসফরাস।এছাড়া, লক্ষণ অনুযায়ী আরও অন্যান্য ঔষুধও ব্যবহার হতে পারে। সতর্কতা: এই ঔষুধগুলি নিজে নিজে ব্যবহার না করে অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে।
* সতর্কতা ও সচেতনতা
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রাথমিক অবস্থায় সর্বাধিক কার্যকর।
সময়মতো চিকিৎসা না নিলে রোগ জটিল ও জীবন-হুমকিস্বরূপ হতে পারে।
আমাদের দেশে সামাজিক কারণে মহিলাদের চিকিৎসা প্রায়শই সুষ্ঠুভাবে হয় না; তাই পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে সকলকে সচেতন হতে হবে।
নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে ক্যান্সারের পুনরাবির্ভাব নিরীক্ষণ করা সম্ভব এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সময়মতো নেওয়া যায়।
সচেতনতা, প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও নিয়মিত চিকিৎসা একজন রোগীকে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ রাখে।
প্রতিরোধ ও সচেতনতা
নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে ক্যান্সার বিষয়ে শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া।
নিজে নিজে নিয়মিত পরীক্ষা করা।
২০ বছর বয়স থেকে মাসিক শেষে স্তন পরীক্ষা।
৪০ বছর বয়সের পর প্রতি বছর চিকিৎসকের কাছে পরীক্ষা করা।
ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের নিয়মিত ম্যামোগ্রাফি করানো।
সুষম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাড়ানো।
পরিশেষে, স্তন ক্যান্সার একটি ভয়ঙ্কর রোগ হলেও এটি প্রতিরোধযোগ্য এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে নিরাময়যোগ্য। প্রাথমিক ধাপে রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সফলতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তাই নিয়মিত স্তন পরীক্ষা করা, যেমন আত্মপরীক্ষা বা চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যকর জীবনধারা বজায় রাখা রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানো—এগুলো সবই রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এছাড়া, পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে জ্ঞান ও নিয়মিত পরীক্ষা করানোর প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করা সম্ভব।
বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থায় সঠিক চিকিৎসা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সার্জারি, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির সমন্বয় রোগীর জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক। চিকিৎসা ও সমর্থনের মাধ্যমে রোগীর শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।
অতএব, সচেতনতা, প্রাথমিক পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা এবং চিকিৎসার সমন্বয়ই স্তন ক্যান্সারের মোকাবেলায় সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এটি শুধুমাত্র জীবন রক্ষা নয়, বরং রোগীর জীবনমান উন্নত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
লেখক:চিকিৎসক, কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
চেম্বার:-ন্যাশনাল হোমিও রিসার্চ সেন্টার,চট্টগ্রাম শাখা
অলংকার শপিং কমপ্লেক্স চট্টগ্রাম।
ইমেইল: drঅক্টোবর মাস: স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস — সতর্ক থাকুন, সুস্থ থাকুন
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
অক্টোবর মাস বিশ্বব্যাপী স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস হিসেবে পালন করা হয়। এটি শুধুমাত্র নারীদের রোগ নয়, পুরুষরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। সমাজে এখনো এ বিষয়ে কুসংস্কার, লজ্জা ও অজ্ঞতা বিরাজ করছে। ফলে রোগীরা দেরিতে চিকিৎসা শুরু করেন এবং প্রাণহানির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ক্যান্সারকে বলা হয় কালান্তর ব্যাধি। এটি যুদ্ধ, দুর্যোগ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে, তবে পার্থক্য হলো—দুর্যোগ কিছু সময় পরে থেমে যায়, কিন্তু ক্যান্সার প্রতিনিয়ত জীবন কেড়ে নিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুসারে, স্তন ক্যান্সার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং সময়মতো সচেতনতা না থাকলে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে।
স্তন ক্যান্সার কি
স্তন ক্যান্সার হল একটি মারাত্মক রোগ, যেখানে স্তনের কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। সাধারণত কোষগুলো নিয়মিতভাবে বিভাজিত হয় এবং পুরনো কোষগুলো মারা যায়। কিন্তু যখন এই নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন কোষগুলো দ্রুত বিভাজিত হয়ে টিউমার বা গাঁটের সৃষ্টি করে।
প্রাথমিক পর্যায়ে টিউমার শুধুমাত্র স্থানীয় থাকতে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি রক্ত বা লিম্ফের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদিও নারীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়, পুরুষরাও আক্রান্ত হতে পারে। অতি সচেতনতা এবং নিয়মিত পরীক্ষা করলে জীবন রক্ষার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
স্তন ক্যান্সারের প্রকারভেদ
১. ডাকটাল কার্সিনোমা ইন সিচু (DCIS) – প্রাথমিক স্তরের ক্যান্সার, যা শুধুমাত্র স্তনের ডাক্টে থাকে এবং অন্যান্য অংশে ছড়ায় না। সময়মতো শনাক্ত করলে সম্পূর্ণরূপে নিরাময় সম্ভব।
২. ইনভেসিভ ডাকটাল কার্সিনোমা (IDC) – সবচেয়ে সাধারণ ধরনের স্তন ক্যান্সার। এটি ডাক্টের বাইরে ছড়িয়ে অন্যান্য অংশে প্রবেশ করতে পারে এবং অন্যান্য অঙ্গেও মেটাস্টেসিস ঘটাতে পারে।
৩. লোবুলার কার্সিনোমা ইন সিচু (LCIS) – লোবুলের কোষে দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে আক্রমণাত্মক নয়, তবে ভবিষ্যতে ইনভেসিভ ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।
৪. ইনভেসিভ লোবুলার কার্সিনোমা (ILC) – লোবুলের কোষে বৃদ্ধি পায় এবং ধীরে ধীরে অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
৫. ট্রিপল নেগেটিভ স্তন ক্যান্সার – এই ধরনের ক্যান্সারের কোষে তিনটি হরমোনের রিসেপ্টর নেই (ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন, HER2)। এটি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং চিকিৎসায় চ্যালেঞ্জিং।
৬. হের২-পজিটিভ স্তন ক্যান্সার – এই ধরনের ক্যান্সারের কোষে HER2 প্রোটিনের উচ্চ মাত্রা থাকে। এটি তুলনামূলকভাবে আক্রমণাত্মক হলেও নির্দিষ্ট ওষুধে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। স্তন ক্যান্সার সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা করলে জীবন রক্ষার সম্ভাবনা অনেক বেশি। নিয়মিত চেকআপ, সেলফ এক্সাম এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্তন ক্যান্সারের উৎপত্তি
স্তনের দুধবাহী নালী বা গ্রন্থির কোষ যখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে শুরু করে, তখন ক্যান্সার তৈরি হয়। প্রথমে ছোট গুটি বা চাকা দেখা যায়, পরে ধীরে ধীরে বড় হয় এবং বগল বা শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো ব্যথা বা দৃশ্যমান লক্ষণ থাকে না, তাই সচেতনতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
লক্ষণ
স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক ও প্রগতিশীল লক্ষণগুলো হলো:
১ . স্তনে গুটি বা চাকা অনুভব হওয়া – স্পর্শে দৃঢ়, অনিয়মিত। ২ . পুরো স্তনে অস্বাভাবিক ফোলাভাব বা আকার পরিবর্তন। ৩. ত্বকে জ্বালা, লালচে ভাব, ডিম্পলিং বা কমলার খোসার মতো চেহারা। ৪ . স্তনবৃন্ত ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া বা আকৃতি পরিবর্তন। ৫ . স্তনবৃন্ত থেকে দুধ ব্যতীত অন্য তরল বা রক্ত নিঃসরণ। ৬ . স্থায়ী ব্যথা বা অস্বাভাবিক টান। ৭. স্তনের ত্বকে গরম ভাব বা প্রদাহ। ৮. স্তনের ওপরিভাগ বা পাশে গিঞ্জি বা গুটি ধরা। ৯. আকারে হঠাৎ পরিবর্তন বা কোনো অংশে সাপের মতো টান অনুভূত হওয়া। ১০. হাত বা বাহুর নীচে লিম্ফ নোড ফোলা বা টান। সচেতন হয়ে সময়মতো ডাক্তার দেখালে চিকিৎসা সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
ঝুঁকির কারণ
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে ঝুঁকি বৃদ্ধি।
পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস (মা, বোন, খালা, ফুপু)।
দেরিতে বিয়ে বা সন্তান না নেওয়া।
স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজন।
দীর্ঘদিন জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন।
মেনোপজের পর হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি।
মদ্যপান, অতিরিক্ত লাল মাংস খাওয়া।
পূর্বে এক স্তনে ক্যান্সার হলে অন্য স্তনেও ঝুঁকি।
বাচ্চাকে বুকের দুধ না খাওয়ানো।
ঝুঁকি কমানোর উপায়
সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন, ৩০ মিনিট হালকা ব্যায়াম।
স্বাভাবিক ওজন বজায় রাখা।
৩০ বছরের মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়া।
শিশুকে অন্তত দুই বছর বুকের দুধ খাওয়ানো।
শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া।
মাংস ও চর্বিজাতীয় খাবার কম খাওয়া।তাই নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা এবং পুষ্টিকর খাদ্য স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
স্তন ক্যান্সার শনাক্তকরণ
নিজে নিজে পরীক্ষা (BSE): মাসিক শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে স্তন পরীক্ষা।
ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন (CBE): চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা করে লক্ষণ শনাক্ত।
ম্যামোগ্রাফি: এক্স-রে দ্বারা স্তনের ছবি তোলা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্ত করা যায়।
নিয়মিত পরীক্ষা ও সতর্কতা জীবন রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিসংখ্যান
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৩,০০০ নারী নতুন করে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।
প্রতিবছর মৃতের সংখ্যা প্রায় ৬,৭৮৩ জন নারী।
দেশের স্তন ক্যান্সারের রোগীর মধ্যে প্রায় ৯৮% নারী এবং ২% পুরুষ।
নারী-পুরুষ মিলিয়ে মোট ক্যান্সার রোগীর মধ্যে ৮.৩% স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত।
বৈশ্বিকভাবে প্রতি ৮ জনে ১ জন নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।
স্তন ক্যান্সারের জটিলতা
শারীরিক: শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়া (মেটাস্টাসিস), ক্রমাগত ব্যথা ও অক্ষমতা।
মানসিক: হতাশা, ভয়, আত্মবিশ্বাস হারানো, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।
অর্থনৈতিক: ব্যয়বহুল চিকিৎসা, পরিবারে আর্থিক চাপ।
সামাজিক: কর্মক্ষমতা হারানো, পরিবার ও সমাজে অবস্থান ব্যাহত।
স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা পদ্ধতি
এলোপ্যাথি চিকিৎসা:
শল্যচিকিৎসা (সার্জারি): টিউমার অপসারণ, প্রাথমিক পর্যায়ে লাম্পেক্টমি বা সম্পূর্ণ স্তন অপসারণ।
কেমোথেরাপি: ওষুধের মাধ্যমে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস।
রেডিয়েশন থেরাপি: উচ্চ শক্তির রশ্মি ব্যবহার করে টিউমার ধ্বংস।
হরমোন থেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপি: HER2 বা হরমোন রিসেপ্টর পজিটিভ ক্যান্সারের জন্য বিশেষ ওষুধ, যেমন ট্রাস্টুজুম্যাব, ট্যামোক্সিফেন।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতি
স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে চিকিৎসা সহজ ও কার্যকর হয়। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার আক্রান্ত টিস্যুকে লক্ষ্য করে ব্যক্তিগত ঔষুধ নির্বাচন করে। সঠিক রোগ নির্ণয় এবং ঔষুধ প্রয়োগ করলে প্রাথমিক স্তরে স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া যায়। তবে সময়মতো চিকিৎসা না নিলে রোগ জটিল হয়ে জীবন-হুমকিস্বরূপ হতে পারে।
একুশ শতকের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় ঔষুধের গুণগত মান উন্নত হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ রোগীর শরীর, ইতিহাস ও লক্ষণ অনুযায়ী ঔষুধ নির্ধারণ করেন। সঠিক চিকিৎসা গ্রহণে স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক আরোগ্য সম্ভব।
অভিজ্ঞ চিকিৎসকগণ প্রাথমিকভাবে যে ঔষুধগুলি নির্বাচন করেন, সেগুলি হলো:
কার্সিনোসিন, কনিয়াম ম্যাকুলাটাম, ফাইটোলাকা ডেকানড্রা, সিলিসিয়া, ক্যালসারিয়া কার্বোনিকা, থুজা অক্সিডেন্টালিস, ল্যাচেসিস মিউটাস, হাইড্রাস্টিস কানাডেনসিস, আয়োডিয়াম, ফসফরাস।এছাড়া, লক্ষণ অনুযায়ী আরও অন্যান্য ঔষুধও ব্যবহার হতে পারে। সতর্কতা: এই ঔষুধগুলি নিজে নিজে ব্যবহার না করে অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে।
* সতর্কতা ও সচেতনতা
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রাথমিক অবস্থায় সর্বাধিক কার্যকর।
সময়মতো চিকিৎসা না নিলে রোগ জটিল ও জীবন-হুমকিস্বরূপ হতে পারে।
আমাদের দেশে সামাজিক কারণে মহিলাদের চিকিৎসা প্রায়শই সুষ্ঠুভাবে হয় না; তাই পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে সকলকে সচেতন হতে হবে।
নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে ক্যান্সারের পুনরাবির্ভাব নিরীক্ষণ করা সম্ভব এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সময়মতো নেওয়া যায়।
সচেতনতা, প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও নিয়মিত চিকিৎসা একজন রোগীকে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ রাখে।
প্রতিরোধ ও সচেতনতা
নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে ক্যান্সার বিষয়ে শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া।
নিজে নিজে নিয়মিত পরীক্ষা করা।
২০ বছর বয়স থেকে মাসিক শেষে স্তন পরীক্ষা।
৪০ বছর বয়সের পর প্রতি বছর চিকিৎসকের কাছে পরীক্ষা করা।
ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের নিয়মিত ম্যামোগ্রাফি করানো।
সুষম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাড়ানো।
পরিশেষে, স্তন ক্যান্সার একটি ভয়ঙ্কর রোগ হলেও এটি প্রতিরোধযোগ্য এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে নিরাময়যোগ্য। প্রাথমিক ধাপে রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সফলতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তাই নিয়মিত স্তন পরীক্ষা করা, যেমন আত্মপরীক্ষা বা চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যকর জীবনধারা বজায় রাখা রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানো—এগুলো সবই রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এছাড়া, পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে জ্ঞান ও নিয়মিত পরীক্ষা করানোর প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করা সম্ভব।
বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থায় সঠিক চিকিৎসা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সার্জারি, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির সমন্বয় রোগীর জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক। চিকিৎসা ও সমর্থনের মাধ্যমে রোগীর শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।
অতএব, সচেতনতা, প্রাথমিক পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা এবং চিকিৎসার সমন্বয়ই স্তন ক্যান্সারের মোকাবেলায় সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এটি শুধুমাত্র জীবন রক্ষা নয়, বরং রোগীর জীবনমান উন্নত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
লেখক:চিকিৎসক, কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
চেম্বার:-ন্যাশনাল হোমিও রিসার্চ সেন্টার,চট্টগ্রাম শাখা
অলংকার শপিং কমপ্লেক্স চট্টগ্রাম।