কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকা উত্তরের অতিরিক্ত কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে থাকা অবস্থায় ড. তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, লুটপাট, আয় বহির্ভূত কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠার পর তিনি পদোন্নতি লাভ করেছেন। এবার তিনি হয়েছেন শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক। তার বিরুদ্ধে মানববন্ধন, মিছিল, ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে হয়তো আরেক দফা তার পদোন্নতি হবে।
এ পরিস্থিতিতে দুটি ঘটনা আমার বারবারই মনে পড়ছে। বাড্ডা এলাকার একজন স্বেচ্ছাসেবক লীগ কর্মির বিরুদ্ধে হামলা, ভাংচুর, মারামারি সংক্রান্ত ৭টি মামলা রুজুর পর পরই তাকে দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এবার ওই নেতার বিরুদ্ধে মাদক সংক্রান্ত নতুন আরো ৬টি মামলা দায়ের হওয়ায় তিনি দলটির সাধারণ সম্পাদক পদে আসীন হন। তার মামলা সংখ্যা ২৩টি হওয়ার পর সভাপতি পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ঠিক একই রকম আরেকটি ঘটনা ঘটে আগারগাঁও এলাকায়।
সেখানে ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীদের গড়ে তোলা ‘স্টার লীগ’ বড়ই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে। এ সংগঠনের সভাপতি আবুল হাসেম হাসু তিনটি খুন, চারটি অস্ত্রসহ ১৭ মামলার আসামি। সিনিয়র সহসভাপতি কাসুর বিরুদ্ধে খুন, জবরদখল, লুটপাট, ছিনতাই-ডাকাতি সংক্রান্ত ১৪টি মামলা ঝুলছে। সাধারণ সম্পাদক লম্বু কাজলের বিরুদ্ধে আছে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও অস্ত্র আইনের ১১টি; সাংগঠনিক সম্পাদক কিলার সোহেলের বিরুদ্ধে ১৩টি এবং কোষাধ্যক্ষ হারুনের বিরুদ্ধে আছে ১২টি মামলা। এমনকি সাধারণ সদস্য হিসেবে স্টার লীগে স্থান পাওয়া ঠাণ্ডুর মাথায়ও ঝুলছে ৯টি মামলা। এভাবেই সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটির ১৫ সদস্যের সবাই একাধিক মামলার আসামি। যার মামলার সংখ্যা যতো বেশি তিনি ততো বেশি গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করেছেন। এখন সন্ত্রাসীদের আদলে সরকারি দপ্তরগুলোর সিনিয়রটি জুনিয়রিটির শ্রেণীবিন্যাস শুরু হচ্ছে কি না তা এই তাজুলকে ঘিরে প্রশ্ন উঠলেও অবাক হওয়ার কিছু দেখছি না।
এসব কারণ বিবেচনায় নিয়েই তাজুল সাহেবের নানা অপকর্ম নিয়ে বারবার যেমন প্রতিবেদন তৈরি করা থেকে বিরত থাকছি তেমনি অব্যাহত হুমকি ধমকি দেয়ার পরও তার বিরুদ্ধে সারাদেশে সাংবাদিকদের প্রতিবাদ বিক্ষোভ করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়ে আসছি। কি জানি, বারবার নিউজ করায় আর প্রতিবাদ বিক্ষোভের কারণে ড. তাজুল যদি বড় অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হন এবং তার জের ধরে আরো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হলে দেশটারই যে বারোটা বাজবে।
তা না হলে ২০২১ সালে প্রথম ড. তাজুলের বিরুদ্ধে বেপরোয়া সম্পদ অর্জন সংক্রান্ত অভিযোগ দুদকে জমা হয় কিন্তু তা অনুসন্ধানের নামে শুধু সময়ই ক্ষেপণ চলে। এরমধ্যেই তার এক দফা পদোন্নতি ঘটে। দ্বিতীয় দফায় আরো সুনির্দ্দিষ্টভাবে তার সহায় সম্পদের বিবরণ তুলে ধরে দুদকে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা মাত্র তিনি দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদ লাভে সক্ষম হন। এবার উচ্চ আদালতের নির্দেশে দুদক আনুষ্ঠানিক ভাবে তদন্ত শুরু করায় আরো চিন্তিত হয়ে পড়লাম। দুদকের সার্টিফিকেটে তিনি এখন দুর্নীতিমুক্ত সাদা মনের শ্রেষ্ঠ অফিসার হিসেবে পুরস্কৃত হন কি না আল্লাহ জানেন।
তবে উচ্চ আদালত থেকে তাজুলের বিষয়টি নিস্পত্তির আদেশ দেয়ার পর থেকেই তিনি চরম বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এবং ঢাকা প্রতিদিন পত্রিকার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছেন। শুধু তাই নয়, এবার তার অর্থে আজ্ঞাবহ একটি চক্রকে ঢাকা প্রতিদিনের সম্পাদক মঞ্জুরুল বারী নয়ন ও তার পরিবার পরিজনের পেছনেও নামিয়ে দিয়েছেন। তারা নামে বেনামে নানারকম দরখাস্ত, আবেদন, নিবেদন পাঠিয়ে বিতর্কিত করাসহ নানাভাবে হয়রানির পাঁয়তারা শুরু করেছেন। সম্পাদক সাহেবের কোনো ভাই, স্বজনের কপালে রাজাকার তিলক এঁটে দেয়া হচ্ছে, কাউকে বানানো হচ্ছে পেশাদার অপরাধী। আবার কারো কারোকে সমাজ বিরোধী আখ্যা দিয়ে এসব দরখাস্ত লিখে তা বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানোর কাজ চলছে জোরেসোরে। অতিসম্প্রতি ঢাকা প্রতিদিনে প্রকাশিত একটি মন্তব্য কলামে তার এসব পরিকল্পনার কথা আগাম প্রকাশও করা হয়েছিল।
স্বজন পরিজনদের নানামুখি বিপাকে ফেলে সম্পাদককে ওই দুর্নীতিবাজ তার আজ্ঞাবহ বানাতে চান। পাশাপাশি পত্রিকাটির বিরুদ্ধে আবারও কোনো প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে বন্ধ করার অলীক স্বপ্ন দেখছেন হয়তো। কিন্তু সরকার মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে যথেষ্ঠ সতর্ক অবস্থানে থাকার বিষয়টি হয়তো ড. তাজুলরা আন্দাজ করতে পারছেন না। বুঝতে পারছেন না যে, নির্বাচনের এই পূর্বক্ষণে পত্রিকা বন্ধ বা সাংবাদিক হয়রানির কোনো অপকর্মে সরকার পা ফেলবে না। আমলাদের প্রভাব-ক্ষমতার বলয় একচ্ছত্র রাখা হবে না, ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হবে। উচ্চ ও মাঝারি পদগুলোতে ব্যাপক রদবদলের ঘটনাতেও বেপরোয়া অর্থবিত্তের মালিক লুটেরা কর্মকর্তারা তা আন্দাজ করতেও পারছেন না।
তবে সম্পাদক বা তার স্বজন পরিজনের উপর ব্যক্তিগত কি ধরনের আক্রোশ মেটানো হয় তা পর্যবেক্ষনে থাকুক। কিন্তু এই মুহূর্তে ঢাকা প্রতিদিনের বিরুদ্ধে আবারও দরখাস্তবাজীর দানবটার দাঁত উপরে ফেলার জন্য সারাদেশে সাংবাদিক সমাজের প্রতি বিনয়ী আবেদন রইলো। রাজধানীসহ জেলা উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিক বন্ধুগণ আসুন আমরা সমবেত হই এবং একযোগে একমঞ্চে দাঁড়িয়ে তাজুলদের রক্তচক্ষু ও অসভ্যতার চির অবসান ঘটাতে উদ্যোগী হই।