ছাত্র রাজনীতির হাত ধরেই বাঙালি জাতি সামলেছে রাজনীতির বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ থেকে শেখ হাসিনা সরকারের পতন, শিক্ষার্থীরাই নিয়েছে অগ্রণী ভূমিকা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হাত ধরে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে। বাংলাদেশের গঠিত হয়েছে শান্তিতে নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেই সরকারেও রয়েছেন শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা।
তবু পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক করা যায়নি। এখনও বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনে দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের। তাতে হিমশিম খাচ্ছে রাষ্ট্র। বাধাগ্রস্থ হচ্ছে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন। ছাত্ররাজনীতিতে তথা ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক রাজনীতি বা ছাত্র সংসদ কেন্দ্রিক সক্রিয়তা স্বাভাবিক। তবে প্রশ্ন উঠেছে, পড়াশোনার বদলে শিক্ষার্থীদের মূল ধারার রাজনীতিতে অতিসক্রিয়তা জাতির জন্য ক্ষতিকারক হয়ে উঠবে না তো?
ছাত্ররাই যে কোনও জাতির ভবিষ্যৎ। শিক্ষা ছাড়া কোনও জাতির মেরুদন্ড শক্ত হতে পারে না। দেশ ও জাতির উন্নয়নে শিক্ষিত সম্প্রদায় সবচেয়ে জরুরি। বর্তমান সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিভিন্ন গবেষণা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। কিন্তু ছাত্র আন্দোলনেই শুধু শিক্ষার্থীরা জড়িয়ে থাকলে দেশের পক্ষে সেটা মঙ্গলজনক হতে পারে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হলেও এখন তাদের পড়াশুনাতেই ফিরে যাওয়া উচিত। পড়াশুনোর পালা শেষ করে তারা রাজনীতিতে আসতেই পারেন।
কিন্তু পড়াশোনা বন্ধ করে শুধু রাজনীতি করাটা দেশের পক্ষে মোটেই সুখকর নয়। মনে রাখতে হবে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীকে হারিয়েছি। এবারও অনেক প্রতিভা হিংসার শিকার হয়েছে। তাই নতুন করে আর যাতে ক্ষতি না হয় তাই সকল শিক্ষার্থীর উচিত শিক্ষাঙ্গনে ফিরে গিয়ে পড়াশোনাতেই মনোনিবেশ। পড়াশোনাটাকেই তাদের সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই উপকৃত হবে দেশ।
শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও ক্যাম্পাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও। কিন্তু তিনি ডাক দিলেও শিক্ষার্থীরা অনেকেই এখনও রাজপথ আগলে বসে রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কাজেও জড়িয়ে পড়ছেন অনেকে। শিক্ষার্থীদের ওপর দেশবাসীর প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু পড়াশোনা বন্ধ করে তারাও যদি রাজনীতির গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে দেয় তবে অভিভাবকদের মতোই দেশবাসীর মধ্যেও হতাশার সৃষ্টি হবে। তাই তাদের বেশি গুরুত্ব দিতে হবে পড়াশোনাটাকেই।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ড. ইউনূস বলেছিলেন, ‘এখনই সময় পড়াশোনায় ফেরার। কেননা বিপ্লবের সুফল ঘরে তুলতে আমাদের একটি সুশিক্ষিত ও দক্ষ প্রজন্মের দরকার’। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘বিপ্লবের সময় তোমরা পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে বন্ধুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন ঘুমহীন রাত কাটিয়েছ এবং দিনে নিষ্ঠুর শাসনকে প্রতিহত করার জন্য পরস্পরের থেকে চিরবিদায় নিয়ে রাস্তায় নেমেছ। বিপ্লব শেষ হওয়ার পর তোমরা দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও তাদের উপাসনালয় পাহারা দিয়েছ, সারা দেশে ট্রাফিক পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছ’। শিক্ষার্থীদের সেই সময়কার ভূমিকার তিনি প্রশংসা করলেও তিনি জানেন, জাতিকে উচ্চশিক্ষিত করে তুলতে না পারলে ভবিষ্যত মোটেই আলোকিত হতে পারে না। তাই গণ অভ্যুত্থানকে সমর্থন করলেও ছাত্র রাজনীতিতে লাগাম টানতে চেয়েছেন তিনি।
ওই সময় প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেছিলেন, ‘আমাদের তরুণ বিপ্লবীরা দেশের মানুষের মনে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন জাগিয়ে দিয়েছে, তা পূরণে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। শহিদদের আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করতে চাই। এক নতুন যুগের সূচনা করতে চাই’। কিন্তু ড ইউনূস চাইলেও শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ রাজনীতির মাঠ ছাড়তে নারাজ। তারা এখনও সক্রিয় রাজনীতির ময়দানে। ক্ষমতার স্বাদ পেতেই বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে তাদের বিরুদ্ধে।
এমনকী, বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিচিত নেতাদের মতোই অনেকে তোলাবাজি, চাঁদাবাজির মতো অপকর্মেও যুক্ত বলে অভিযোগ। ছাত্র রাজনীতির মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করে কেউ কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে নেমে পড়েছে। এটা কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্যকে কলুষিত করবে। পরিচিত নেতা-নেত্রীদের মতো তারাও হয়ে উঠবেন কলঙ্কিত। শাসক দলের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে বিভীষিকাময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল সেটা ফিরে আসাটাই হবে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
আওয়ামী লীগের দুঃশাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে গণ অভ্যুত্থানের সাক্ষী থেকেছে দেশ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ই জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অন্তত ৬৪০ জন নিহত হয়েছে। আহতের সংখ্যা ১৯ হাজার ২০০ জনেরও বেশি। বেসরকারি মতে, সংখ্যাটি আরও বেশি। এই বিপুল পরিমান মানব সম্পদ আমরা হারিয়েছি। নিহতদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন বেশ প্রতিভাবান শিক্ষার্থী।
বহু সম্ভাবনা হারিয়ে গিয়েছে চিরকালের মতো। দেশের পক্ষে এটা খুবই ক্ষতিকারক। তাই আমাদের এখন নতুন করে নতুন উদ্দমে দেশ গঠনের কাজে হাত দিতে হবে। সংস্কার প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রক্রিয়া চলাকালে সকলকে তাদের নিজেদের দায়িত্ব পালন করতেই হবে। খেয়াল রাখতে হবে ছাত্র রাজনীতি যেন ফের দূষিত না হয়ে ওঠে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণপিটুনি বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিকে কালিমালিপ্ত করেছে। সবাই নিন্দা করছে এই দুটি ঘটনার। তাই ছাত্র রাজনীতির হাত ধরে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ হয়েছে ছাত্র রাজনীতি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও একই আওয়াজ উঠেছে। ঢাকায় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে রাজনীতি বন্ধ না করে সংস্কার এবং ডাকসু নির্বাচনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে।
কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরাই স্লোগান তুলেছে, ‘এক দফা এক দাবি, চাই না কোনো রাজনীতি’, ‘ডান-বামের রাজনীতি, চাই না তোদের উপস্থিতি’, ‘রাজনীতির অংশীদার, এই মুহূর্তে ক্যাম্পাস ছাড়’। আসলে সময় হয়েছে শিক্ষাঙ্গনে ফের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে নিয়ে আসার। নতুবা শিক্ষাঙ্গনে ফের অনুপ্রবেশ ঘটবে দুষ্কৃতীদের।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকেও উঠে এসেছেন অনেক নতুন নেতৃত্ব। উপদেষ্টামণ্ডলীতে রয়েছেন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এবং আসিফ মাহমুদ। তারা দু’জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। নাহিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আসিফ। এছাড়াও প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের বিশেষ সহকারী হয়েছেন মো. মাহফুজ আলম। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র।
তাদের অনেকেরই পড়াশোনা শেষ। আবার অনেকে এখনও ছাত্র। যারা ছাত্র তাদের উচিত পড়াশোনা শেষ করে তবেই রাজনীতিতে আসা। মনে রাখতে হবে, ড. ইউনূসের মতো বিশ্ববন্দিত অর্থীনীতিবিদের হাতে রয়েছে দেশ পরিচালনার ভার। তার সাফল্যের জন্যই চাই উচ্চ শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের। তাই শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ক্লাসে ফিরতে হবে ছাত্রদের। এর কোনো বিকল্প আমাদের হাতে নেই।
তারিকুল রাসেল, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক