আমদানি নির্ভর বাসমতি টাইপের অতি লম্বা ও সবচেয়ে সরু ধানের আবাদে সাফল্য মিলেছে।
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) উদ্ভাবিত বিনাধান-২৫ কৃষকের আয় দ্বিগুণ করতে সক্ষম। ধানের বাম্পার ফলন দেখে লাভজনক এ ধানের চাষাবাদ সম্প্রসারণে আগ্রহ দেখাচ্ছেন কৃষকরা।
বিনা ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে ময়মনসিংহে বিনা উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ধানের জাত পরিচিতি, উৎপাদন কলাকৌশল ও শস্যবিন্যাসে অন্তর্ভুক্তকরণ বিষয়ক কৃষি প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং বিনা ধান-২৫ এর প্রচার ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার অষ্টধর ইউনিয়নে মঙ্গলবার (১২মে) কৃষক প্রশিক্ষণ ও মাঠ দিবসে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন ময়মনসিংহ সদর আসনের সংসদ সদস্য মোঃ আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ। বিনার মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ শরিফুল হক ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ময়মনসিংহ অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সালমা আক্তার, বিনা বোর্ড অব ম্যানেজমেন্টের কৃষক প্রতিনিধি একেএম আনিসুজ্জামান, বিনার মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল ও বিনার এসআরএবি প্রকল্পের পরিচালক ড. মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম তরফদার উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বিনার কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘ গবেষণার পর এ সাফল্য এসেছে। বিনাধান-২৫ মূলত ব্রি ধান-২৯ এর বীজে জাপানের একটি ল্যাবে ৪০ গ্রে মাত্রার কার্বন আয়রন রশ্মি প্রয়োগ করে উদ্ভাবন করা হয়েছে। যা চেকজাত ব্রি ধান ৫০ থেকে ১০ শতাংশ ফলন বেশি দিতে সক্ষম। প্রিমিয়াম কোয়ালিটির এ ধান আগাম পাকে। চাষাবাদের ১৩৮ থেকে ১৪৮ দিনেই এ ধান ক্ষেত থেকে সংগ্রহ করা যায়। বিনাধান-২৫ ব্রি ধান-২৯ এর চেয়ে ১৫ থেকে ২০ দিন আগে পাকে। এ ধানের গড় ফলন হেক্টর প্রতি সাড়ে ৭ মেট্রিক টন থেকে সাড়ে ৮ মেট্রিক টন। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে উদ্ভাবিত ধানের জাতের মধ্যে বিনাধান-২৫ সর্বাধিক লম্বা ও সরু আকৃতির। জমিতে পানি জমে থাকা বা বৈরী আবহাওয়ায় প্রচ- ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়ে ধান গাছ সাধারণত সাময়িক হেলে পড়। পরে জমি থেকে পানি সরে গেলে এবং রৌদ্রোজ্জ্বল অবস্থায় বিনাধান-২৫ জাতটি ২-৩ দিনের মধ্যে পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে আসে। সেই সঙ্গে স্বাভাবিক ফলন দেয়। এর ধানের চলের ভাত ঝরঝরে ও খেতে সুস্বাদু।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, এধানে রোগ ও পোকার আক্রমণ নেই বললেই চলে। এ ধান চাষে পানি কম লাগে। ইউরিয়া সার সাশ্রয়ী। এ জন্য বিনাধান-২৫ কে ইউরিয়া, পানি ও বালাইনাশক সাশ্রয়ী জাত বলা যায়। ধানের গাছ লম্বা বেশি। তাই কৃষক প্রচুর খড় পাবেন । এ জাতের চাষাবাদ সম্প্রসারিত হলে গো-খাদ্যের সংকট নিরসন হবে । এটি যেমন প্রিমিয়াম কোয়ালিটি, অল্প জীবনকাল সম্পন্ন আবার ফলনও বেশি দেয়। তাই কৃষক এ ধান চাষে দ্বিগুণ লাভবান হবেন।
অনুষ্ঠানে বিনার কর্মকর্তারা জানান, দেশে চাহিদা অনুসারে লম্বা ও চিকন প্রিমিয়াম কোয়ালিটি চাল অপ্রতুল থাকায় মোটা ও মাঝারি চালবিশিষ্ট ধানের জাতের চাল পলিশ করে মিনিকেট, পাজাম, নাজিরশাইল, জিরাশাইল ইত্যাদি নামে বাজারজাত করা হয়। ফলে প্রতি টন চালে ১০ কেজি করে চাল নষ্ট হচ্ছে এবং চালের ভিটামিন ‘বি’, প্রোটিন, ফাইবার, জিংক, আয়রন ইত্যাদি পুষ্টি উপাদান থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি। পাশাপাশি পলিশ করা চালের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশি হওয়ায় তা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ক্ষতিকর। এসব সমস্যা দূর করতে বিনার উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ গবেষণার মাধ্যমে প্রিমিয়াম কোয়ালিটি চালবিশিষ্ট বিনা ধান-২৫ জাতটি উদ্ভাবন করেছে। বিনা ধান-২৫ এর চাল প্রিমিয়াম কোয়ালিটির হওয়ায় পলিশ করার প্রয়োজন পড়ে না। এছাড়া এ জাতটি চিকন চালের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখবে।
প্রধান অতিথি বলেন, “আমার বাবা একজন প্রকৃত কৃষক ছিলেন। তাই কৃষকের সুখ-দুঃখ আমি বুঝি। আমি আপনাদের হৃদয়ের টানে এখানে এসেছি। আমি কৃষকের সন্তান, এটাকে নিয়ে গর্ববোধ করি। কৃষকের জীবিকা আরও উন্নত করার জন্য বিনা কর্তৃক উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাতের ধান কৃষকদের মাঝে পৌঁছে দেওয়া, তাদের উৎসাহ দেওয়া এবং এ জন্য কৃষকদের প্রণোদনাসহ সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। প্রধানমন্ত্রীর এই কথার মূল্যায়ন করার জন্য আমরা এই কাজগুলোকে উন্নতভাবে ত্বরান্বিত করতে চাই।”