ইসলামের প্রতিটি দিন ও মাসের নিজস্ব মাহাত্ম্য রয়েছে। হিজরি সনের চতুর্থ মাস হলো রবিউস সানি বা রবিউল আখির, যা মুসলিম সমাজে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশেষ করে এই মাসের দ্বিতীয় জুমা আল্লাহর কাছে প্রিয় ইবাদতের সুযোগ এনে দেয়। ভারতীয় উপমহাদেশে এই দিনকে “ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম” নামেও ডাকা হয়। এটি মহান ওলি আল্লাহ, গাউসে আজম হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর ওফাত দিবস স্মরণে পালন করা হয়।
শুক্রবারের মর্যাদা
শুক্রবারকে আল্লাহ তায়ালা সপ্তাহের মধ্যে সর্বোত্তম দিন হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। কুরআনে সূরা জুমা, আয়াত ৯-এ বলা হয়েছে:
“হে ঈমানদারগণ! যখন জুমার দিনে নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ত্যাগ করো।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:- সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিন হলো শুক্রবার।শুক্রবারের এই মহত্ত্বের কারণে, রবিউস সানির দ্বিতীয় জুমা আমাদের জন্য বিশেষ বরকত ও মর্যাদা বহন করে। এদিনের আমল যেমন নেকির সঞ্চার করে, তেমনি ব্যক্তির জীবনে আল্লাহর নিকটতা ও শান্তি প্রদান করে।
রবিউস সানির দ্বিতীয় জুমায় করণীয় আমল
হাদিস ও কোরআনসূত্রের আলোকে এদিনের আমলগুলোকে সাতটি মূল ভাগে ভাগ করা যায়:
১. জুমার নামাজ আদায় করা
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:-যে ব্যক্তি জুমার নামাজে উপস্থিত হবে, আল্লাহ তার সপ্তাহব্যাপী ছোট-ছোট পাপ মাফ করে দেন। এটি নির্দেশ করে যে, জুমার নামাজে অংশগ্রহণ শুধু ফরজ নয়, বরং পাপমুক্তির এক বিশাল সুযোগ। খুতবা মনোযোগ সহকারে শোনা এবং তা হৃদয়ে ধারণ করা একটি সুন্নত। হাদিসে আরও এসেছে যে, খুতবার সময় মনোযোগ হারানো মানুষকে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। অতএব, মুসলিমদের উচিত এই দিনে ত্বক্তিপূর্ণভাবে নামাজ ও খুতবা অনুসরণ করা।
২. ফরজ নামাজ যথাসময়ে আদায় করা
ফরজ নামাজ ইসলামের মূল ভিত্তি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:-যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিতভাবে আদায় করে, সে আল্লাহর নিকট সেরা লোকের মর্যাদা পায়।রবিউস সানির দ্বিতীয় জুমা এই ফরজ নামাজে মনোনিবেশ করার জন্য বিশেষ সুযোগ। এ দিনে নিয়মিত নামাজ আদায় করলে ব্যক্তি জীবনের সকল কাজকে ইসলামিক ধারার সঙ্গে সমন্বয় করতে সক্ষম হয়।
৩. কোরআন তিলাওয়াত
কোরআন তিলাওয়াত সবসময় গুরুত্বপূর্ণ, তবে জুমার দিনে এটি বিশেষ ফজিলত নিয়ে আসে। হাদিসে এসেছে:যে ব্যক্তি জুমার দিনে সূরা কাহাফ পাঠ করবে, আল্লাহ তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় আলোকিত করবেন।এটি একটি শক্তিশালী আমল, যা ব্যক্তি ও পরিবারকে বরকত প্রদান করে। মৃত মুসলমানদের জন্য পাঠ করলে তা ইসালে সওয়াব হিসেবে যায়। কোরআন তিলাওয়াতের সময় যে মনোযোগ ও ধারাবাহিকতা থাকে, তা ব্যক্তি জীবনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৪. দরূদ শরীফ ও ইস্তিগফার
দরূদ শরীফ পাঠ নবীজি (সাঃ)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ। হাদিসে এসেছে:
“যে ব্যক্তি প্রতি জুমার দিনে আমার প্রতি দশটি দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ দশটি পাপ মাফ করবেন।একই সঙ্গে ইস্তিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা জরুরি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:পাপ মোচনের জন্য প্রতিদিন তওবাহ ও ইস্তিগফার করো।এই আমল ব্যক্তি ও সমাজের নৈতিক দিককে শক্তিশালী করে।
৫. আছরের পর দোয়া করা
জুমার দিনে আছরের নামাজের পরে এমন একটি সময় আসে, যখন দোয়া কবুল হয়। হাদিসে এসেছে:যে ব্যক্তি জুমার দিন আছরের নামাজের পরে দোয়া করবে, আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করবেন।”
এই সময়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া করা যেতে পারে:
১. দুনিয়া-আখেরাতে কল্যাণের দোয়া:- রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাহ, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়াকিনা আজাবান্নার।
২. উত্তম জীবনযাপনের দোয়া:-আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা, ওয়াত তুক্বা, ওয়াল আফাফা, ওয়াল গেনা।
৩. মা-বাবাসহ সকল মুমিনের জন্য দোয়া:-রব্বানাগ-ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়্যা ওয়ালিল মুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।এই দোয়াগুলি আমাদের জীবনে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করার শক্তিশালী মাধ্যম।
৬. গরিব ও দুঃখীদের সাহায্য
হাদিসে এসেছে:-যে ব্যক্তি একজন গরিবকে সাহায্য করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।রবিউস সানির দ্বিতীয় জুমা এমন একটি দিন, যা দান-সদকা, খাবার বিতরণ ও দরিদ্রদের সহায়তার মাধ্যমে সমাজে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বন্ধন বৃদ্ধি করে। মুসলিমদের উচিত এই দিনে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দান করা এবং দরিদ্রদের সাহায্য করা।
৭. নেকজনদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ
হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে এসেছে:-নেক লোকদের সঙ্গে মিলিত হও, কারণ তারা তোমার ইমানকে বৃদ্ধি করবে।নেক ব্যক্তিদের ধৈর্য, ত্যাগ, তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অনুসরণ আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নয়নে সহায়ক।
যা করা উচিত নয়
কোনো নির্দিষ্ট দিনে ফাতেহা বা মাহফিলকে ফরজ বা সুন্নত হিসেবে প্রচলিত করা উচিত নয়।খাস দিনে বিশেষ খাদ্য বা মিষ্টি তৈরি করে এটিকে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা বানানোও গ্রহণযোগ্য নয়। হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:-ইবাদত হৃদয় থেকে হবে, বাহ্যিক আচার থেকে নয়।এটি নির্দেশ করে যে, কোনো দিনকে অযথা রীতিনীতির মাধ্যমে বড় ধরণের ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা বানানো উচিত নয়।
রবিউস সানির দ্বিতীয় জুমার শিক্ষা
রবিউস সানির দ্বিতীয় জুমা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগ, ফরজ নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, দরূদ ও ইস্তিগফার এবং দোয়া করা জীবনের মূল দিক। পাশাপাশি, গরিব ও দুঃখীদের সহায়তা এবং নেকজনদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ আমাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশ নিশ্চিত করে।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:-যে ব্যক্তি আমার প্রতি ভালোবাসা এবং আমার সুন্নাহ অনুসরণ করবে, আল্লাহ তাকে জীবনে শান্তি ও বরকত দান করবেন।রবিউস সানির দ্বিতীয় জুমা আমাদের জন্য সেই সুযোগ এনে দেয়। এই দিনে প্রার্থনা, তওবা, কোরআন পাঠ, দরূদ ও দান আমাদের জীবনকে আলোকিত করে এবং উভয় দুনিয়ার কল্যাণ নিশ্চিত করে।
পরিশেষে বলতে চাই,রবিউস সানির দ্বিতীয় জুমা আমাদের জন্য এক বিশেষ আধ্যাত্মিক সুযোগ, যা আল্লাহর নিকটতা, নেক আমল এবং জীবনের সঠিক পথ অনুসরণের জন্য প্রেরণা যোগায়। এই দিনে জুমার নামাজে উপস্থিত হওয়া, ফরজ নামাজ নিয়মিত আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, দরূদ শরীফ পাঠ ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে আমরা আমাদের মন ও হৃদয় আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করতে পারি। আছরের পর দোয়া করার সময়ে আল্লাহর কাছে যে প্রার্থনা করা হয়, তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে, যা আমাদের দুনিয়া ও আখেরাত উভয় দিকের কল্যাণ নিশ্চিত করে।
এছাড়া, গরিব ও দুঃখীদের সাহায্য করা এবং নেকজনদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা আমাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রবিউস সানির দ্বিতীয় জুমা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইসলাম শুধুমাত্র বাহ্যিক আচার নয়, বরং হৃদয় থেকে আল্লাহভীরু হওয়ার শিক্ষা দেয়। এই দিনে করা প্রতিটি সৎ কাজ আমাদের জীবনে শান্তি, বরকত এবং সৌভাগ্য নিয়ে আসে।
সুতরাং, রবিউস সানির দ্বিতীয় জুমা কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মরণ নয়, এটি আমাদের জন্য আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের সুযোগ। আল্লাহ আমাদের সকল আমল কবুল করুন, আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন এবং উভয় দুনিয়ার কল্যাণ দান করুন। আল্লাহুম্মা আমীন।
লেখক,কলাম লেখক ও ইসলাম বিষয়ক গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি