কবিতা সত্য ও সুন্দরের ধারক ও বাহক। কবিতা সৌন্দর্য সৃষ্টি করে, ঝাঁঝালো মিছিলের মতো চেতনাকে জাগ্রত করে। কবিতা মানবতাবোধ, জীবনবোধ ও চেতনাবোধ বিকশিত করে। কবিতা আনে শান্তি ও স্বস্তি।
গত ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ সাতক্ষীরা কবিতা পরিষদের আয়োজনে সাতক্ষীরা ৩০ মাইল অগ্রগতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো এক বর্ণাঢ্য কবিতাউৎসব। পৌষের শীতল সকালে, যখন প্রকৃতি আড়ষ্ট আর জীবনযাপন কিছুটা ক্লান্তিকর, তখন কবিদের মিলনমেলা হয়ে ওঠে মনোমুগ্ধকর এক উৎসব।
সকাল ৯টায় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। জাতীয় শোকদিবস উপলক্ষে পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী রোজ বাবু। পতাকা উত্তোলন করেন অধ্যাপক আব্দুল হামিদ। এরপর অগ্রগতি সংস্থার মিলনায়তনে শুরু হয় আলোচনা পর্ব, সেমিনার ও কবিতা আবৃত্তির আয়োজন।
অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও আবৃত্তিকার মাসকুর-ই-সাত্তার কল্লোল। ঘোষণাপত্র পাঠ করেন সরদার মোহাম্মদ নাজিমউদ্দীন এবং শোকপ্রস্তাব পাঠ করেন মিল্টন সানা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি কামরুল ইসলাম ফারুক ও উষার নির্বাচনী পরিচালক মো. সামসুদ্দিন। প্রধান সমন্বয়কারীর বক্তব্য রাখেন মৃত্যুঞ্জয় কুমার বিশ্বাস এবং যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে বক্তব্য দেন শাহনাজ পারভীন। প্রধান উপদেষ্টা শুভ্র আহমেদ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
অনুষ্ঠানে সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কবিতা পরিষদ পুরস্কার ২০২৫ প্রদান করা হয়। শিশুসাহিত্যে ইমরুল ইউসুফ, কবিতা ও সৃজনশীল সংগঠনে ড. সবুজ শামীম আহসান, কবিতা ও শিল্পায়নে সুহেলী সায়লা আহমেদ, কবিতা ও সংগঠনে শাহীনুর রহমান এবং গবেষণায় ড. মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান ও আমিনুর রশীদ এই সম্মাননা লাভ করেন।
দ্বিতীয় পর্বে বেলা ১১টায় অনুষ্ঠিত হয় সেমিনার। সভাপতিত্ব করেন সাতক্ষীরা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও লেখিকা নাজমুল নাহার। সেমিনারের মূল প্রবন্ধ ছিল—“সাহিত্যে সাতক্ষীরার অবদান”। প্রবন্ধটি পাঠ করি আমি নিজে—শহিদুল ইসলাম, সরকারি ইস্পাহানী ডিগ্রি কলেজ, কেরানীগঞ্জের দর্শনের প্রভাষক।
বিকেল ২টা ৩০ মিনিটে শুরু হয় কবিতাপাঠ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত প্রায় শতাধিক কবি ও সাহিত্যিক এতে অংশগ্রহণ করেন। মধ্যাহ্নভোজে ছিল বাঙালির চিরচেনা মাছ-ভাত, ডাল ও ডিম—যার স্বাদে যুক্ত হয় আন্তরিকতা।
কবি ও সাংবাদিক সুকুমার দাশ বাচ্চুর সঞ্চালনায় কবিতাপাঠ করেন কবি এ খেতাদার আলী, শাহনাজ পারভীন, সবুজ শামীম আহসান প্রমুখ। প্রথম পর্বে সভাপতিত্ব করেন কবি ও আবৃত্তিকার মন্বয় মনির।
এই প্রবন্ধ রচনার সময় আমার ব্যক্তিগত জীবন ছিল প্রবল সংকটে। ক্যান্সারে আক্রান্ত আব্বা, অসুস্থ আম্মা এবং ছোট সন্তানের দায়িত্ব—সব মিলিয়ে লেখা সহজ ছিল না। তবু সাহিত্যিক দায়বদ্ধতা আমাকে টেনেছে জন্মভূমি সাতক্ষীরায়। তাই শত কষ্টে হলেও প্রবন্ধটি পাঠিয়েছিলাম। প্রথম প্রুফ দেখার সুযোগ পেলেও চূড়ান্ত প্রুফ দেখার সময় পাইনি।
১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ শুক্রবার এসপি গোল্ডেন লাইন পরিবহনে ঢাকায় থেকে সাতক্ষীরায় যাই এবং বড় আপার বাসায় রাত্রিযাপন করি। উৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় আমার ছবি ও চৌদ্দ পৃষ্ঠার প্রবন্ধটি ছাপা হয়—যা আমার জন্য পরম আনন্দের।
প্রবন্ধে আমি সাতক্ষীরার সাহিত্যিক ঐতিহ্য আলোচনা করেছি—খান বাহাদুর আহছানউল্লা, সিকান্দার আবু জাফর, মাওলানা মোয়েজউদ্দীন হামিদী (রহ.), খান সাহেব আব্দুল ওয়ালি, আনিস সিদ্দিকী, কাজী রোজীসহ বহু সাহিত্যিকের অবদান উল্লেখ করি। পাশাপাশি উল্লেখ করি—যদি কোনো বিখ্যাত নাম অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়ে যায়, সে জন্য আমি দুঃখিত।
প্রবন্ধপাঠ শেষে কিছু কঠিন সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। আলোচনায় অংশ নেন কবি শেখ সিদ্দিকুর রহমান, কবি মতুহিন, কবি সিদ্দিক আলী প্রমুখ। সভাপতির বক্তব্যে লেখিকা নাজমুল নাহার প্রশংসা ও উৎসাহ প্রদান করেন এবং বলেন—সমালোচনাই লেখককে পরিণত করে।
আমি বলেছি—পৃথিবীতে কেউ পরিপূর্ণ নয়। সবার নাম উল্লেখ করতে গেলে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ লিখতে হয়। প্রধান ব্যক্তিত্বদের নাম তুলে ধরার চেষ্টা করেছি এবং অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির দায় স্বীকার করেছি।
শেষে আমি কামনা করেছি—সাতক্ষীরার সাহিত্যচর্চা আরও বেগবান হোক এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ অবস্থান তৈরি করুক। এই গবেষণামূলক প্রবন্ধ আমার জীবনে সেমিনারে পঠিত প্রথম প্রবন্ধ—যা আমার কাছে স্মরণীয় ও গর্বের।
পরিশেষে, সাতক্ষীরাবাসী সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবদান রেখে ধন্য হোক—এই প্রার্থনা।