প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে শাল্লা কত দূর?

মতামত

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নাম আগে যারা শোনেননি, গত কয়দিনে তারা নিশ্চয়ই প্রত্যন্ত উপজেলার নাম শুনেছেন। এই এলাকা এক সময় প্রগতিশীল আন্দোলনের জন্য পরিচিত ছিল। করুণা সিন্ধু রায় এবং তার পুত্র বরুণ রায় ছিলেন কৃষক এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতা। করুণা সিন্ধু রায় অবিভক্ত ভারতে আসাম প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন দিরাই-শাল্লা থেকে। তিনি কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। কিন্তু তিনি কৃষক দরদি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ছিলেন সদা সোচ্চার। প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়নে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। তার সুযোগ্য পুত্র বরুণ রায় ছাত্র জীবন থেকেই প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি অল্প বয়সেই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। জেল-জুলুম ছিল তার নিত্যসঙ্গী।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে দিরাই-শাল্লা থেকে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলেন বরুণ রায়। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এই এলাকা থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ন্যাপের প্রার্থী সুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত। ১৯৮৬ সালে বরুণ রায় দিরাই-শাল্লা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল। এখানে পরে সুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত আমৃত্যু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এই এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের সংখ্যা যথেষ্ট। প্রগতিশীল রাজনীতির ঐতিহ্যবাহী এলাকা শাল্লায় হিন্দু এবং মুসলমান- দুই ধর্মের মানুষ শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছেন যুগ যুগ ধরে। দেশের অন্য কোথাও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা গেলেও শাল্লা কিংবা দিরাইতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

এবার তার ব্যতিক্রম ঘটলো। শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে গত ১৭ মার্চ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। শাল্লার নোয়াগাঁওয়ের হিন্দু সম্প্রদায়ের বেশ কিছু বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে পাশের দিরাই উপজেলার একটি গ্রামের মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে, প্রস্তুতি নিয়ে।

প্রথমে শোনা গিয়েছিল, হেফাজতে ইসলামের অনুসারীরা এই হামলার জন্য দায়ী। এখন জানা যাচ্ছে, হেফাজতের নাম সামনে এলেও আক্রমণের মূল পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী শহীদুল ইসলাম স্বাধীন। এই স্বাধীন একটি ইউনিয়ন কাউন্সিলের সদস্য। তার সঙ্গে নোয়াগাঁওয়ের কয়েকজনের সঙ্গে জলমহলে মাছ চাষ নিয়ে বিরোধ চলছিল। তারমধ্যে একজনের নাম ঝুমন দাস। এই ঝুমন দাস তার ফেসবুকে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মামুনুল হককে নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে বিতর্কের সূচনা করে।

বলা হয়েছে, ঝুমন দাস ‘আপত্তিকর’ স্ট্যাটাস দিয়ে মামুনুল হকের সমর্থকদের খেপিয়ে দিয়েছে। তাই তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ঝুমনকে শাস্তি দেওয়ার দাবি জানিয়ে এলাকায় মিছিল করেছে। অঘটন ঘটার আশঙ্কায় হিন্দুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানান। এমন কি আপত্তিকর স্ট্যাটাসদাতা ঝুমন দাসকেও পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় উত্তেজনা প্রশমনের জন্য। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকেও হিন্দুদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল এই বলে যে, কিছুই ঘটবে না । অথচ হামলার ঘটনা ঠিকই ঘটলো এবং কয়েকশ মানুষ সম্পদ হারা হলেন সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, একটি ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষের বিশ্বাসে চিড় ধরলো। সারাদেশে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ায় একটি বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হলো। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জীবন ও সম্পদ যে নিরাপদ নয়, সে বিষয়টি আবার সামনে এলো।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটলো যখন আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান পালন করছি। রাজধানী ঢাকার প্যারেড গ্রাউন্ডে দশ দিন ব্যাপী স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন হয়েছে গত ১৭ মার্চ। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ। এছাড়া চীনসহ কয়েকটি দেশের সরকার প্রধানের ভিডিও বার্তাও প্রচার করা হয়েছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে।

শাল্লার ঘটনাটিকে ‘বিচ্ছিন্ন’ বলে এক ধরনের তৃপ্তির ঢেকুর তোলার মতো মুক্তবুদ্ধির মানুষ আমাদের দেশে অনেক আছেন। তারা আসলে সত্যকে মানতে লজ্জাবোধ করেন। এক ধরনের মুখস্থ কথা বলতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ভেতরে দূরারোগ্য ব্যাধি পুষে বাইরে ভালো থাকার অভিনয় করে কপট সুখ অনুভব করছি। আমাদের সমাজে, রাজনীতিতে, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে যে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির প্রসার ঘটেছে, সংখ্যালঘুদের নিয়েও যে রাজনীতির কৌশলের খেলা চলছে এবং সংখ্যালঘুদের মুখচেনা কিছু নেতাও যে এই খেলায় বুঝে বা না-বুঝে শরিক হচ্ছেন, এটা অনেকেই মানতে চান না।

শাল্লায় যে ঘটনা ঘটলো প্রায় একই ধরনের ঘটনা এর আগে দেশের আরো কয়েকটি জায়গায় ঘটেছে। রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ, আরো কোনো কোনো জায়গায় সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হয়েছে। ফেসবুকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ তুলে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়ে হামলা, লুটপাটের একটি প্যাটার্ন দাঁড়িয়ে গেছে। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই যে, হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্বাসী একজন তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ইসলাম ধর্মানুসারীদের অনুভূতিতে আঘাত করে থাকেন, তাহলে ওই নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়াই তো যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু একজনের অপরাধে গোটা সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালানোর কি কোনো যুক্তি থাকতে পারে? অথচ প্রতিটি ঘটনায় দেখা যাচ্ছে একজনের দোষে শাস্তি ভোগ করছে অনেকে।

শাল্লায় হিন্দু গ্রামে হামলা হেফাজত সমর্থকেরা চালিয়েছে বলা হলেও যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের কারো কারো রাজনৈতিক পরিচয়ে সরকারি দলের সংশ্লিষ্টতার কথা জানা গেছে। স্বাধীন নামের যে ব্যক্তিকে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার রাজনৈতিক পরিচয় যুবলীগ বলে গণমাধ্যমে আসার পর এখন যুবলীগ বলছে, স্বাধীন যুবলীগের কেউ নন। প্রশ্ন হলো, এতদিন এলাকায় স্বাধীন যুবলীগের পরিচয় দিয়ে দাপট দেখিয়ে এলেও তা কেন যুবলীগ অস্বীকার করেনি, কিংবা তার বিরুদ্ধে কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? দলের মধ্যো বানের পানির মতো আবর্জনা ভেসে এলে তা পরিষ্কার করার দায়িত্ব কার?

আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় আছে তিন মেয়াদে। এই ধরাবাহিক স্থিতিশীলতা দেশের উন্নয়নের জন্য সহায়ক ফল দিচ্ছে। কিন্তু টানা ক্ষমতায় থাকার কিছু খারাপ দিকও আছে। পদ-পদবির জন্য এক ধরনের অসুস্থ্ প্রতিযোগিতা নানা ধরনের সমস্যা তৈরি করে। সুযোগ সন্ধানীরা দলে ভিড় করে। আওয়ামী লীগে এখন সেরকম অবস্থা চলছে বলে অনেকে মনে করছে। ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য আদর্শিক অবস্থানে নমনীয়তার অভিযোগও এখন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে উঠছে। দলের মধ্যে অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা আছে বলে মনে হয় না।

বিএনপি এবং হেফাজতের মতো সাম্প্রদায়িক শক্তির অবস্থানের সঙ্গে আওয়ামী লীগকে আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে পড়ছে। একসময় দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-আক্রমণের ঘটনা ঘটলে বা তেমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং অন্য প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তি সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়াতো কিংবা সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সাহস ও মনোবল জোগাতো। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা দেখা যায় না। হামলা বা আক্রমণকারীরা বিনাপ্রতিরোধে তাদের দুষ্কর্ম করতে পারে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের বছরে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সব ধর্মবিশ্বাসের মানুষের রক্তের বিনিময়ে এই দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চা করেছেন আজীবন। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে শাল্লার ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর যেন না ঘটে।

লেখক : বিভুরঞ্জন সরকার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *