দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ যেন এক অদ্ভুত স্থবিরতার চক্রে আটকে আছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৫-এ ১৮২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। অর্থাৎ সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের কাতারে এবারও বাংলাদেশ। ১০০-এর স্কেলে স্কোর মাত্র ২৪, যা বৈশ্বিক গড় ৪২-এর তুলনায় প্রায় অর্ধেক। পরিসংখ্যানের ভাষায় এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রশাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর অসুস্থতার প্রতিচ্ছবি। গত বছরের তুলনায় স্কোরে ১ পয়েন্ট উন্নতি হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিক র্যাঙ্কিংয়ে আমরা এক ধাপ পিছিয়েছি। এই চিত্র আসলে একটি কঠিন বাস্তবতাই তুলে ধরে: সামান্য অগ্রগতি দিয়ে কাঠামোগত দুর্নীতিকে ঢেকে রাখা যায় না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিবাচক মূল্যায়নের কারণেই এই সামান্য উন্নতি; কিন্তু সংস্কার প্রক্রিয়ার দুর্বলতা ও মাঠপর্যায়ের দুর্নীতি মিলিয়ে সেই সম্ভাবনাও ম্লান হয়ে গেছে। অর্থাৎ পরিবর্তনের সুযোগ এসেছিল; কিন্তু তা কাজে লাগানো যায়নি। এখানেই মূল প্রশ্ন: কেন বারবার আমরা সুযোগ হারাই? দুর্নীতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। সরকারি সেবা নিতে ঘুষ, টেন্ডারে কমিশন, নিয়োগে অনিয়ম, ব্যাংকিং খাতে ঋণ কেলেঙ্কারি- সব মিলিয়ে একটি দুর্নীতি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই সংস্কৃতিতে জবাবদিহির বদলে প্রভাব, দক্ষতার বদলে দলীয় আনুগত্য আর আইনের বদলে আপসই হয়ে উঠেছে চালিকা শক্তি। তাই নতুন সরকারের প্রতি জনগণের প্রথম চাওয়া কঠোর আইন করে হলেও এই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতেই হবে। একটি নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার জাতির আকাক্সক্ষার কথাই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বলেছেন।
দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং উন্নয়ন কর্মকান্ড-সহ যাবতীয় বিষয়ে হাতে হাত রেখে সবাইকে সেই কাজে অংশগ্রহণ করতে তারেক রহমান আহ্বান জানিয়েছেন। দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রতি এই আহ্বান একটি ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের। দেশমাতৃকার সামগ্রিক উন্নয়নে কাজ করার জন-ঐক্যের আহ্বান। এটা শুধু কথার কথা নয়, স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের দিন থেকে শুরু হয়েছে তার এই দৃষ্টিভঙ্গি-স্নাত আহ্বান। বোঝা যাচ্ছে, তিনি তার দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। দেশের গণতন্ত্র ফেরানোই এই সরকারের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য পূরণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিএনপির কাছে প্রজ্ঞা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনকল্যাণমুখী চেতনা প্রত্যাশা করেছেন। জামায়াতের কাছে দায়িত্বশীল ভূমিকা আর এনসিপিকে আদর্শ অক্ষুন্ন রাখার তাগিদও দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক লক্ষ্য আর দেশ গঠনের উপায় নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বিত রূপই মূলত সংসদ ও সরকারের মধ্যে গড়ে ওঠে কল্যাণকর প্রতিযোগিতা। সরকারি কাজের সমালোচনা যুক্তিনির্ভর এবং দায়িত্বশীল হলে, দেশ গড়ে তোলায় কোনো বিঘ্নই বড় হয়ে উঠতে পারে না।মানুষ সেটাই দেখতে চায়।শপথ নিতে যাওয়া নতুন সরকারের সকল সাংসদদের কাছে। এই চেতনার একটি আবহও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে মন্ত্রিসভা গঠনের চিন্তা-ভাবনায়। যেহেতু নবীন-প্রবীণের সমন্বয়েই গঠিত হতে যাচ্ছে মন্ত্রিসভা। অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের নতুন চিন্তা ও শক্তি-সাহসের সংমিশ্রণে সৃষ্টি হবে মন্ত্রিপরিষদ।এর আকার টেকনোক্র্যাটসহ ৫০ হতে পারে।সংবিধান অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সাংসদরা শপথ নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন এবং শপথ পড়াবেন। আর প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন দেবেন মন্ত্রীদের। তারপর রাষ্ট্রপতি তাদের শপথ পড়াবেন।
যেকোনো মূল্যে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন এই সংসদ সদস্যগন। অন্যায় বরদাশত করা হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারেক রহমান।দেশের স্বার্থরক্ষা করে বিদেশনীতি কায়েমের অঙ্গীকারও তাদের মধ্যে আছে। এসব অঙ্গীকার খুবই জরুরি। কেননা, দেশ গঠনে এর বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। আমাদের সমাজ নিরাপদ নয়। নির্বাচন-উত্তর সহিংসতা চলছে, আহত হয়েছে ৬৯ জন। ধর্ষণের অভিযোগও উঠেছে। সহিংসতা রোখার দাবি করেছে ১১ দলীয় জোট ও ডাকসু। নির্বাচন বিদেশি পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনে প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রহণযোগ্য হলেও, সেই আবেশ নিয়ে বসে থাকলে হবে না। সরকারের পক্ষ থেকে ওই সব দুর্বিপাক নির্মূলের বিকল্প নেই। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়, সমাজ থেকে ওই সব অন্তর্ঘাত নির্মূল করার পাশাপাশি ন্যায়, কল্যাণ ও উন্নয়নের ধারাপাত অব্যাহত রাখাই হবে নতুন সরকারের রাজনৈতিক ভিশন। একে বাস্তবায়ন করতে হলে সরকার এবং প্রশাসনকে নতুন উদ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্বাচনে পুলিশের ভালো পারফরম্যান্স এটাই প্রমাণ করেছে, তারা ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। আমরা সেই ভূমিকাই দেখতে চাই তাদের কাছে, যা সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করে সামাজিক অগ্রগতিকে মসৃণ করে তোলে। সত্যিকার গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে সংসদে প্রতিফলিত হয় বিরোধী দলের যুক্তিশীল আলোচনায়, সেটা জাতি দেখতে চায়। ভূপাতিত গণতন্ত্রকে সঠিক পথে তুলে আনতে নতুন সরকারের যে প্ল্যান উপস্থাপিত হয়েছে সেখানে আরও কিছু যোগ করার থাকলে, সেই ভূমিকা বিরোধী দলকে পালন করতে হবে। সবাই মিলে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখতে না পারলে, আমরা জনআকাক্সিক্ষত প্রত্যাশা পূরণ করতে পারব না।
বিশ্ব ও অঞ্চলগত তুলনা করলে বাংলাদেশের জন্য দুর্নীতির বিষয়টি আরও বিব্রতকর। ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো যেখানে ৮০-এর ওপরে স্কোর নিয়ে স্বচ্ছতার উদাহরণ, সেখানে দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটানও ৭১ স্কোর করেছে। ভারত, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা-অনেক দেশই বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। এমনকি দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকা দেশগুলোও আমাদের চেয়ে ভালো অবস্থানে। কিন্ত বাংলাদেশ কেন এবং কোথায় পিছিয়ে আছে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতেই হবে। আমার মতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানের অভাব। দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে,তদন্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকলে আর বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় ভুগলে-দুর্নীতিবাজরা সাহসী হয়, সৎ মানুষ নিরুৎসাহিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারও স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি-এ কথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। এ অবস্থা থেকে বেরোতে হলে চাই কাঠামোগত সংস্কার। স্বাধীন ও শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনা জরুরি।দুর্নীতিকে কেবল আইন দিয়ে নয়,সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।দুর্নীতি নিয়তি নয়;এটি রাজনৈতিক ও নৈতিক সিদ্ধান্তের ফল।সেই সিদ্ধান্ত বদলানোর সাহসই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই পারে দুর্নীতির দুষ্টচক্র থেকে দেশকে বের করে আনতে। নতুন সরকার দুর্নীতির এই করাল গ্রাস থেকে জাতিকে মুক্ত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, যুক্তরাজ্য