সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ০৬:০৮ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
সরিষাবাড়ীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু জামালপুরে জজের সহায়তায় হয়রানির অভিযোগ, এলাকাবাসীর মানববন্ধন ভেঙে পড়া গোয়াতলা বেইলি ব্রিজ পরিদর্শনে সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স গোয়াইনঘাটে তিনদিন ব্যাপী কৃষি প্রযুক্তি মেলার উদ্বোধন পাইকগাছায় স্ত্রীর সামনে প্রসাব করার প্রতিবাদে প্রকাশ্য জনসম্মুখে নৃশংসভাবে যুবককে হত্যা কৃষিপণ্য রপ্তানিতে গোলকধাঁধা: আমলাতন্ত্র নাকি বাস্তব সংকট? বাংলাদেশে গৃহপালিত প্রাণীতে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়নি: বাকৃবির গবেষণা গৃহবধূকে যৌন নিপীড়নের মামলায় গ্রেপ্তার যুবক একদিন পরই জামিনে মুক্ত ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ফের অবৈধ বালু উত্তোলনের শঙ্কা, নদীভাঙন আতঙ্কে এলাকাবাসী রেমিট্যান্স সমৃদ্ধ ফটিকছড়িতে নেই কোন সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ফটিকছড়ির বনাঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ কাঠ জব্দ চট্টগ্রামে ১১দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশ সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি বন্দরে লাশ নিয়ে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর থানা ঘেরাও, দারোগা ক্লোজড ঝালকাঠিতে নদী ভাঙ্গন রোধ ও সড়ক সংস্কারের দুই দফা দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত সালথায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে সংকটে জনবল ও ঔষধ সাতক্ষীরায় ফিরল লেবাননে নিহত দুই প্রবাসীর মরদেহ, শোকে গ্রামবাসী হাতে-পায়ে গুলি করে ১৭ হাজার ডলার ছিনতাই কাউখালীতে কলেজ ছাত্র তরুণ উদ্যোক্তা শান্তোর গ্রীষ্মকালীন লাউ চাষে সফলতা কাপ্তাইয়ে সিসিএইচপি’র জেন্ডার বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত পাইকগাছায় জমি কিনে বিপাকে ব্যাংক কর্মকর্তা: থানায় অভিযোগ শেরপুরে ১৯২ বোতল ভারতীয় মদসহ যুবক গ্রেফতার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে সদস্য হলেন ডা. লিটন এমপি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে নারী মাদক কারবারি গ্রেফতার সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমেই মাদক ও সন্ত্রাস দমন সম্ভব: পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস শ্রীপুর পৌরসভার টানা ৪বারের মেয়র মারা গেছেন, শোকে বড় বোনের মৃত্যু কেন্দ্রীয় যুবদলে দায়িত্ব পেয়ে শুভেচ্ছায় সিক্ত মাহমুদুল হাসান বাপ্পী প্রশাসনের অভিযানে মুকসুদপুরে কথিত কবিরাজের চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ জৈন্তাপুরে আব্দুল গফফার চৌধুরী খসরু’র পক্ষ থেকে চিকিৎসা সহায়তা প্রদান ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আহত সেই যুবকের মৃত্যু,পুলিশের নিস্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তালতলীতে বজ্রপাতে ছেলে নিহত, বাবা আহত

কৃষিপণ্য রপ্তানিতে গোলকধাঁধা: আমলাতন্ত্র নাকি বাস্তব সংকট?

আহাদ শিকদার
সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ২:৩৭ অপরাহ্ন

বাংলাদেশ অর্থনৈতি এমন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হওয়া উচিত রপ্তানি অথচ রপ্তানিকারকই সবচেয়ে বেশি বাধার সম্মুখীন।

কিন্তু এটি কোনো? বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি, আমলাতান্ত্রিক কাঠামো এবং উন্নয়ন কৌশলের গভীর সংকটের প্রতিফলন হচ্ছে?

বিশ্বব্যাপী হালাল খাদ্য বাজারের আকার বর্তমানে ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু হালাল মাংস খাতের বাজারই ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীগুলোর একটি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এই বাজারে কার্যত অনুপস্থিত।

প্রশ্ন হচ্ছে, সমস্যা কি উৎপাদনে, নাকি রাষ্ট্রীয় কাঠামোয়? বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। মাছ উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দেশ। সবজি, আলু এবং গবাদিপশু উৎপাদনেও বাংলাদেশের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। ঈদুল আজহায় দেশীয় পশু দিয়েই প্রায় সম্পূর্ণ কোরবানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে, যা কয়েক দশক আগেও কল্পনাতীত ছিল।কিন্তু কৃষি উৎপাদনে এই সাফল্য আন্তর্জাতিক বাজারে রূপান্তরিত হচ্ছে না। এর কারণ উৎপাদন ঘাটতি নয়! বরং উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো ভ্যালু চেইনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।

একজন উদ্যোক্তা যদি বাংলাদেশের বাইরে মাংস রপ্তানি করতে চান, তাহলে তাকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, কোয়ারেন্টাইন বিভাগসহ বহু দপ্তরের অনুমোদন নিতে হয়। প্রায় ১৫-২০ সনদ নিতে হয়, এটা একটা অদৃশ্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। যা শুর করার আগেই অনেকে ঝড়ে পড়ে যায়। অনেক তরুন উদ্যোক্তাই “ERC” লাইসেন্স করে! কিন্তু এই জটিলতায় তারা হারিয়ে যায়।

অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় “Transaction Cost” বা লেনদেন ব্যয়। অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ দেখিয়েছিলেন, উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের পার্থক্য অনেকাংশে নির্ধারিত হয় এই লেনদেন ব্যয়ের ওপর।যেখানে ব্যবসা শুরু করতে কম সময়, কম অনুমোদন এবং কম অনিশ্চয়তা প্রয়োজন হয়, সেখানেই বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন বৃদ্ধি পায়।

একটা দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন করার জন্য মৌলিক প্রশ্ন হলো কিভাবে একটি কৃষিনির্ভর অর্থনীতি শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হবে?

১৯৫৪ সালে অর্থনীতিবিদ আর্থার লুইস তার বিখ্যাত Dual Economy Model এ দেখিয়েছিলেন, কৃষি খাতের উদ্বৃত্ত শ্রমকে শিল্প খাতে স্থানান্তর করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই উন্নয়নের মূল গতিপথ।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর কৃষির অবদান জিডিপির প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে কমে ১১ শতাংশের আশেপাশে নেমে এসেছে। কিন্তু কর্মসংস্থানের বড় অংশ এখনও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ কৃষি থেকে মানুষ বের হয়েছে, কিন্তু পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল শিল্পে প্রবেশ করতে পারেনি।
ফলাফল হিসেবে দেখা যাচ্ছে, নিম্ন মজুরির অনানুষ্ঠানিক খাতের বিস্তার। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব এবং কৃষকের আয় স্থবিরতা। এ অবস্থায় কৃষি শিল্পায়নই হতে পারত সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

বাংলাদেশ প্রতি বছর লাখ লাখ টন আলু উৎপাদন করে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত খাদ্য শিল্প সীমিত হওয়ায় বিপুল পরিমাণ আলু নষ্ট হয়। তাছাড়া কাঁচা চামড়া উল্লেখযোগ্য হারে উৎপাদন করে, কিন্তু উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্যের বড় অংশ বিদেশে তৈরি হয়। তুলা ও সুতা শিল্প থাকলেও বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়।

অর্থাৎ আমরা মূলত কম মূল্যের কাঁচামাল উৎপাদন করছি, কিন্তু উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারিনি।

অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় “Low Value Trap”।

আমরা যতদিন পর্যন্ত কৃষি উৎপাদনকে শিল্পের সাথে সংযুক্ত করা না যাবে, ততদিন কৃষকের আয়ও বাড়বে না, রপ্তানিও বাড়বে না।

বাংলাদেশের কৃষি বাজারে হিমাগার মালিক, আমদানিকারক, পাইকারি ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন লাইসেন্সনির্ভর গোষ্ঠী একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্লক গড়ে তুলেছে। রপ্তানি সহজ হয়ে গেলে কৃষক আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ পাবে। যার ফলে, মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা কমে যাবে। তাইতো, বিদ্যমান কাঠামো রপ্তানিকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে জটিল রাখার মধ্যেই অনেকের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিহিত। হিমাগার, বীজ, সার ও বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। কৃষক কম দাম পায়, ভোক্তা বেশি দাম দেয়, কিন্তু মধ্যবর্তী পর্যায়ে বিপুল মুনাফা সঞ্চিত হয়।

মানসুর ওলসনের Collective Action Theory ব্যাখ্যা করে কেন ক্ষুদ্র কিন্তু সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠী প্রায়ই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে জিম্মি করে রাখতে সক্ষম হয়। এ কারণেই রপ্তানি প্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর সংস্কার না হলেও আমদানির ক্ষেত্রে তুলনামূলক দ্রুত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

আমাদের আরেকটি প্রশাসনিক এবং আমলাতান্ত্রিক ব্যার্থতা হচ্ছে, যে উদ্যোক্তা বৈধভাবে ডলার দেশে আনতে চায়, তাকে অসংখ্য অনুমোদনের জন্য দৌড়াতে হয়।অন্যদিকে অর্থপাচার, ওভার-ইনভয়েসিং, আন্ডার-ইনভয়েসিং কিংবা হুন্ডির মতো অবৈধ কার্যক্রম বহু বছর ধরেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

আমলাতান্ত্রিক কৌশল রাষ্ট্রের তরুণ উদ্যোক্তাদের বৈধ ব্যবসার চেয়ে অবৈধ কার্যক্রমকে তুলনামূলক সহজ করে তোলে, তাহলে অর্থনীতি ধীরে ধীরে উৎপাদনশীল খাত থেকে রেন্ট-সিকিং খাতে সরে যায়।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল নতুন পোশাক কারখানায় নয় বরং কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল মাংস, দুগ্ধশিল্প এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের মধ্যেই নিহিত। রাষ্ট্র যদি উদ্যোক্তার পথ সহজ করে, তবে কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা এবং জাতীয় অর্থনীতি সকলেই লাভবান হবে। যদি ব্যাঘাত ঘটে, তাহলে সম্ভাবনার পাহাড় নিয়েও বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে সীমিত অর্থনীতি হিসেবেই রয়ে যাবে।


এই বিভাগের আরো খবর