বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে কিছু বাজেট কেবল একটি অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন দিকনির্দেশনার দলিল হিসেবেও বিবেচিত হয়।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট তেমনই একটি বাজেট। কারণ এটি শুধু একটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নয়, বরং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার অর্থনৈতিক দর্শনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং জনগণের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের বাস্তবতায় এই বাজেট প্রণীত হয়েছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশি। মানুষ এমন একটি বাজেট দেখতে চেয়েছিল, যেখানে শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান থাকবে না; বরং থাকবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা। প্রস্তাবিত বাজেট সেই প্রত্যাশার একটি শক্তিশালী উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ আজ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে। সংখ্যার এই বিস্তার নিঃসন্দেহে অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির প্রমাণ। কিন্তু বড় বাজেটের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো উন্নয়নের চরিত্র। সেই জায়গায় এবারের বাজেট একটি নতুন বার্তা দিয়েছে—উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রাখা হয়েছে। সমালোচকেরা ঘাটতির আকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো বিশ্বের প্রায় সব উন্নয়নশীল অর্থনীতিই উৎপাদনশীল বিনিয়োগের জন্য ঘাটতি বাজেট গ্রহণ করে। প্রশ্ন হলো ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় হবে। যদি সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা ভবিষ্যৎ অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
এই বাজেটের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। সরকারের ঘোষিত ১০টি অগ্রাধিকার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাজেটের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ। “সবার জন্য উন্নয়ন” স্লোগানটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। বহু বছর ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে একটি সমালোচনা ছিল—প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। শহর ও গ্রামের মধ্যে, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে, কেন্দ্র ও প্রান্তিক অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য রয়ে গেছে। নতুন বাজেট সেই বাস্তবতাকে স্বীকার করে উন্নয়নের সুফল সর্বস্তরে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
শিক্ষা খাতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব এই বাজেটের অন্যতম ইতিবাচক দিক। বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ভর করে নয়, বরং জ্ঞান ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করেই এগিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার উন্নয়নের ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, মানবসম্পদ উন্নয়নই ছিল তাদের অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশও এখন সেই বাস্তবতার মুখোমুখি। ফলে বাস্তবমুখী, দক্ষতা-নির্ভর এবং প্রযুক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কৌশলগত বিনিয়োগ বলেই বিবেচনা করতে হবে।
একজন তরুণ যখন মানসম্মত শিক্ষা পায়, তখন সে শুধু একটি চাকরির জন্য প্রস্তুত হয় না; বরং উদ্যোক্তা হওয়ার, নতুন ধারণা সৃষ্টি করার এবং দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। তাই শিক্ষা খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের মূলধন হিসেবে দেখা প্রয়োজন। বাজেট সেই উপলব্ধির প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতেও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রশংসার দাবি রাখে। একটি দেশের অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার জনগণ সুস্থ থাকে। অসুস্থ জনগোষ্ঠী কখনোই উৎপাদনশীল অর্থনীতির ভিত্তি হতে পারে না। সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার এই বাজেটে করা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমবে এবং মানবসম্পদের সামগ্রিক মান উন্নত হবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রশ্নে বাজেটের অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই জনশক্তিকে যদি উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত করা না যায়, তাহলে তা সম্ভাবনার পরিবর্তে বোঝায় পরিণত হতে পারে। এ কারণেই শিল্পায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং উদ্যোক্তা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক কৌশল নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষারও একটি কার্যকর উপায়।
কৃষির প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিও বাস্তবমুখী। কৃষিকে শুধু একটি উৎপাদন খাত নয়, বরং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং জীবিকার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, গবাদিপশু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও কৃষিবীজসহ প্রায় ৬০টি জরুরি পণ্যের ওপর উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর একটি সাহসী উদ্যোগ। এর মাধ্যমে সরকার স্পষ্টভাবে বাজার স্থিতিশীলতা ও ভোক্তা স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছে।
ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এই বাজেট একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়, আর কর্মসংস্থান ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনও সম্ভব নয়। প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, ব্যবসা সহজীকরণ এবং বিনিয়ন্ত্রণকরণের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপও সময়োপযোগী। অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো আর্থিক খাত। যদি আমানতকারী আস্থা হারান, যদি ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না থাকে, তাহলে অর্থনীতির চাকা স্বাভাবিকভাবে ঘুরতে পারে না। তাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে এই বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কর্মসূচি হিসেবে দেখা উচিত।
একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে সরকার আগামী দিনের বাংলাদেশকে কল্পনা করার চেষ্টা করেছে। কারণ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রযুক্তি ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়, আবার জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় পরিবেশ সুরক্ষা ছাড়া উন্নয়ন টেকসইও হতে পারে না।
সবশেষে, এই বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সম্ভবত প্রশাসনিক সংস্কার। স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রীয় সেবার মান বৃদ্ধি পাবে, দুর্নীতি কমবে এবং জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। উন্নয়নের প্রতিটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।
নিঃসন্দেহে এই বাজেটের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সংস্কার—সবই কঠিন কাজ। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার উন্নয়নকে কেবল সংখ্যার খেলা হিসেবে দেখছে না; বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত একটি সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের প্রকল্প হিসেবে দেখছে।
তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে শুধু একটি অর্থনৈতিক দলিল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি নতুন বাংলাদেশের একটি রূপরেখা, যেখানে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানুষ, আর সেই মানুষকে ঘিরেই নির্মিত হচ্ছে রাষ্ট্রের আগামী দিনের স্বপ্ন।
লেখক: লেখক ও গবেষক।