রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০৮:৪১ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
কাউখালীতে রাস্তার উপরে সাঁকো দিয়ে ৫টি গ্রামের মানুষের চলাচল: শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার বরিশাল জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংবধনা পাহাড়ি ঢলে পর্যটন কেন্দ্র জাফলংয়ের শতাধিক দোকান লন্ডভন্ড শাহজাদপুরে বিপুল পরিমাণ অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল পুড়িয়ে ধ্বংস জাতীয় পর্যায়ের ফাইনালে রানারআপ হয়ে গৌরব অর্জন করল ত্রিশাল পাইকগাছায় মাদকসহ আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ, জনমনে আলোচনা-সমালোচনা সাতক্ষীরা ব্রহ্মরাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি হলেন মুকুল ২ যুগ ধরে সংস্কারহীন পাইকগাছার বাইনতলা – খড়িয়া সড়ক : চরম দুর্ভোগে এলাকাবাসী মুরাদনগরে ৭০ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার নথুল্লাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হলেন অ্যাড. আল-আমিন ঝালকাঠি সদর উপজেলা শিক্ষা শিবির অনুষ্ঠিত বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আশিক সাঈদকে ফুলেল শুভেচ্ছা কমলনগরে সরকারি নাম্বার স্ত্রীর ফোনে ‘ফরওয়ার্ড’ ও রুমে এসি চালু রেখে উধাও উপজেলা প্রকৌশলী! মাজারের দান বাক্স ও ডেগ সিলগালার তিনদিনের মাথায় প্রত্যাহার ডিসি সারওয়ার সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় বিএনপি নেতা নিজাম উদ্দিন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শপথ নিলেন ৬১ নবীন নৌ কর্মকর্তা ​কর্মজীবনে ‘নীরব মহামারি’: বাড়ছে শারীরিক-মানসিক ঝুঁকি, প্রয়োজন স্বাস্থ্যবান্ধব কর্মসংস্কৃতি কিশোরগঞ্জে যুবদলের কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক হওয়া সংবর্ধনা ফটিকছড়িতে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু ফটিকছড়িতে যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার ট্রাকের ধাক্কায় গুরতর আহত, পা হারালেন শেরপুরের যুবক মতলব উত্তরের শরীফ উল্লাহ হাইস্কুল এন্ড কলেজে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় উপলক্ষে মিলাদ ও দোয়া সাতক্ষীরায় সুজনের জেলা কমিটি গঠন, সভাপতি পবিত্র মোহন দাস ও সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল মাদক-সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সামাজিক যুদ্ধ গড়ে তোলার আহ্বান প্রিন্সের শুধু খেলাধুলা করলেই চলবেনা, পড়াশোনাও করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী হাইকোর্টে জামিন পেলেও মুক্তি মেলেনি সাংবাদিক আজহার আলী সরকারের, ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’-এ ফের কারাগারে ৩৮ বছরের পুরোনো সেতু দেবে গিয়ে বন্ধ যোগাযোগ, দুর্ভোগে কয়েক গ্রামের মানুষ নায্য বেতনের দাবিতে আন্দোলন, মালিক-শ্রমিক সংঘর্ষ মতলব উত্তরের এখলাছপুরে রোগমুক্তি ও কল্যাণ কামনায় শীতলা মায়ের পূজা পালিত

​কর্মজীবনে ‘নীরব মহামারি’: বাড়ছে শারীরিক-মানসিক ঝুঁকি, প্রয়োজন স্বাস্থ্যবান্ধব কর্মসংস্কৃতি

ময়মনসিংহ ব্যুরো 
রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৬:০৩ অপরাহ্ন

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জোয়ার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-র জয়জয়কার, ডিজিটাল অফিস কিংবা রিমোট ওয়ার্ক—প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক কর্মব্যবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব গতি এনেছে। তবে এই চাকচিক্যময় ও দ্রুতগতির কর্মসংস্কৃতির আড়ালে নিঃশব্দে বিস্তার লাভ করছে এক ভয়াবহ সংকট।

বিশেষজ্ঞরা একে অভিহিত করছেন “সাইলেন্ট ওয়ার্কপ্লেস এপিডেমিক” বা “কর্মক্ষেত্রের নীরব মহামারি” হিসেবে। দীর্ঘক্ষণ ডেস্কে বসে কাজ, অতিরিক্ত স্ক্রিন-নির্ভরতা, অনিদ্রা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং সার্বক্ষণিক অনলাইন সংযুক্তির তীব্র মানসিক চাপ আধুনিক কর্মজীবী মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে এক দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনাররের কার্যালয় আয়োজিত এক সময়োপযোগী “কর্মজীবনে স্বাস্থ্য সচেতনতা: আধুনিক কর্মপরিবেশে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়” শীর্ষক সেমিনার সেমিনারে অংশীজন বিশেষজ্ঞরা এসব মন্তব্য করেছেন।

বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলন কক্ষে(২১ জুন) রবিবার দুপুরে অনুষ্ঠিত সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) জন কেনেডি জাম্বিল। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রফেসর ডা. কামরুজ্জামান মিহির। বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো: আজাদ জাহান, বিভাগীয় কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের পরিচালক ড. মুহাম্মদ মফিজুল ইসলাম, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. কামরুল হুদা, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক বিপিন চন্দ্র বিশ্বাস, পুলিশ সুপার সালাহ উদ্দিন, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক সেঁজুতি ধর, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ খান মো. সাজ্জাদ কবীর, বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ড. শামসাদ জাহান শিরাজী, মোমেনশাহী ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের ক্যান্টনমেন্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার মাহমুদা হাসান, ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম এবং ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম প্রমুখ।

সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতিকে অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে মনে রাখতে হবে—কেবল দক্ষ কর্মী নয়, বরং একজন ‘সুস্থ’ কর্মীই ভবিষ্যৎ অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষা কোনো বিলাসিতা বা দয়া নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল ভিত্তি। এই নীরব মহামারি রুখতে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি—এই তিন পক্ষের সমন্বিত রোডম্যাপ তৈরি করা এবং স্বাস্থ্যবান্ধব কর্মপরিবেশকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

​জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখনই যদি একটি স্বাস্থ্যবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে দেশের উৎপাদনশীলতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জাতীয় অর্থনীতি এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়ার আশংকা রয়েছে।

​বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে অসংক্রামক ব্যাধি (NCD) বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান অনুঘটক হলো এই অনিয়ন্ত্রিত ও গতিহীন প্রাতিষ্ঠানিক জীবন। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা এবং ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগ এখন ডেস্কে আটকে থাকা পেশাজীবীদের নিত্যসঙ্গী।

​গবেষণায় দেখা গেছে, একটানা ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা বসে থাকলে শরীরের সামগ্রিক বিপাকপ্রক্রিয়া (Metabolism) ধীর হয়ে যায়, ব্যাহত হয় রক্তসঞ্চালন এবং মেদ জমতে শুরু করে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি (IT), ব্যাংকিং, গণমাধ্যম, কলসেন্টার, ফ্রিল্যান্সিং ও করপোরেট খাতের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ফ্যাটি লিভার, ক্রনিক ব্যাকপেইন (মেরুদণ্ডের জটিলতা), চোখের সমস্যা এবং অকাল উচ্চ রক্তচাপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। উন্নত বিশ্বে এর সমাধানে ‘স্ট্যান্ডিং ডেস্ক’ বা ‘ওয়াকিং মিটিং’-এর মতো ‘অ্যাকটিভ অফিস কালচার’ জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা এখনও অবাস্তব বিলাসিতা।

​শারীরিক অসুস্থতার সমান্তরালে সমান গতিতে বাড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। অতিরিক্ত কাজের চাপ, লক্ষ্যমাত্রা (Target) পূরণের তীব্র প্রতিযোগিতা, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কর্মীদের ঠেলে দিচ্ছে চরম বিষণ্ণতার দিকে।

​বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে ‘বার্নআউট সিনড্রোম’ (Burnout Syndrome)-কে পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মজীবী মানুষ কোনো না কোনোভাবে তীব্র মানসিক ক্লান্তিতে ভুগছেন।
​কোভিড-পরবর্তী সময়ে ‘ওয়ার্ক ফ্রন্ট হোম’ বা ‘হাইব্রিড মডেল’ কর্মঘণ্টার সীমানাকে মুছে দিয়েছে। ফলে তৈরি হয়েছে ‘ডিজিটাল ফ্যাটিগ’ বা প্রযুক্তিগত ক্লান্তি। এই পরিস্থিতি উত্তরণে বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল, মাইক্রোসফট বা সেলসফোর্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মস্থলে ‘কাউন্সেলিং সাপোর্ট’, ‘মেডিটেশন জোন’ কিংবা ‘মেন্টাল হেলথ ডে’-এর মতো কল্যাণমুখী ধারণাকে তাদের মূল নীতিতে যুক্ত করেছে।

# ​নারী কর্মীদের ওপর ‘দ্বৈত বোঝা’

​বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও কর্মক্ষেত্রে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণ। একদিকে অফিসের অর্পিত দায়িত্ব, অন্যদিকে সনাতন পারিবারিক কাঠামোয় গৃহস্থালি কাজ ও সন্তান লালন-পালনের অলিখিত চাপ—সব মিলিয়ে নারীরা এক অদৃশ্য ‘দ্বৈত চাপে’ পিষ্ট হচ্ছেন।
​দেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এখনও পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন সুবিধা, নির্ভরযোগ্য ডে-কেয়ার সেন্টার কিংবা নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের প্রচণ্ড ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্যমতে, এই পরিবেশগত ও মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেক দক্ষ নারী কর্মী মাঝপথেই ক্যারিয়ার ইস্তফা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
​‘প্রেজেন্টিজম’ ও অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ
​জনস্বাস্থ্যবিদ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্মীদের এই স্বাস্থ্যসংকট এখন আর কেবল ব্যক্তিগত স্তরে সীমাবদ্ধ নেই; এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় ‘রক্তক্ষরণ’।

চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে “Absenteeism” (অসুস্থতার কারণে অনুপস্থিতি)-এর চেয়েও বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে “Presenteeism”। অর্থাৎ, কর্মী অসুস্থ শরীর ও তীব্র মানসিক চাপ নিয়েই অফিসে উপস্থিত থাকছেন, কিন্তু তার উৎপাদনশীলতা বা কার্যকারিতা নেমে যাচ্ছে শূন্যের কোঠায়।

​ডব্লিউএইচও’র হিসাব অনুযায়ী, কর্মীদের এই অসুস্থতাজনিত অনুৎপাদনশীলতার কারণে বিশ্ব অর্থনীতি প্রতি বছর ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই কর্মক্ষেত্রের সুস্থতা এখন আর মানবিক আবেদন নয়, এটি অর্থনৈতিক টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত।
​বৈশ্বিক চর্চা বনাম বাংলাদেশের বাস্তবতা
​উন্নত বিশ্বে এবং এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারত, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়াতেও ‘করপোরেট ওয়েলনেস প্রোগ্রাম’ দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। সেখানে কর্মীদের জন্য ‘ডিজিটাল ডিটক্স আওয়ার’ বা ‘নো-মিটিং ডে’ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

​বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এই সংস্কৃতি চর্চা করলেও তৈরি পোশাক খাত, সরকারি-বেসরকারি মাঝারি শিল্প ও কলকারখানায় চিত্রটি উল্টো। দেশে শ্রম আইন ও পেশাগত নিরাপত্তা নীতিমালা থাকলেও কাগজে-কলমে তার বাস্তবায়ন সীমিত। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর কর্মক্ষেত্রের ‘বাহ্যিক ও পরিকাঠামো গত’ নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা সচেতনতা বাড়লেও, কর্মীদের ‘অভ্যন্তরীণ’ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি এখনও নীতিনির্ধারকদের নজরের বাইরে রয়ে গেছে।


এই বিভাগের আরো খবর