বাংলাদেশের জন্য সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ কেবল একটি শিল্প নয়, বরং এটি উপকূলীয় মানুষের জীবনধারা ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার একটি ভিত্তি।
মৎস্য সম্পদ রক্ষায় প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল থেকে ১১ মে পর্যন্ত মৎস্য আহরণে ৫৮ দিনের যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এই নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য হলো সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মাছের প্রজনন ও উৎপাদন নিশ্চিত করা। বিজ্ঞানসম্মতভাবে মাছের প্রজননকাল হিসেবে নির্দিষ্ট করে এই সময়ে মাছ আহরন, মজুদ ও পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।তবে রাবনাবাদ, আন্ধারমানিক,তেঁতুলিয়া, বুড়াগৌরাঙ্গ ও গঙ্গামতি মোহনাগুতে জেলেদের অবাধ চলাচল এবং স্থানীয় আড়তগুলোতে রীতিমতো মাছ আহরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনে প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে শেষ হলো এ বছরের মৎস্য আহরণে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা।
জানাযায় কিছু অসাধু চক্রের যোগসাজশে আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে কিছু জেলেদের মৎস্য আহরন ছিল প্রতিনিয়ত। রয়েছে ট্রলার প্রতি ‘নিরাপদে মাছ শিকারে জন্য ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ। এনিয়ে জনমনে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও রয়েছে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এমন যদি সত্য হয়,তবে দীর্ঘমেয়াদে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার যে আশঙ্কা রয়েছে তাতে পুরো মৎস্য শিল্পে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে বাড়বে ঝুকি।
এদিকে সরকারি আইন মেনে যারা বাড়িতে বসে থেকেছেন, তারা একদিকে যেমন খেয়ে না খেয়ে দিন কাটিয়েছেন, অন্যদিকে তাদের আয়ের পথ বন্ধ থাকায় তারা আজ ঋণের দায়ে জর্জরিত। কর্মহীন থাকা ৫৮টি দিন জেলেদের সংকট আসলেই অমানবিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু সরকারের নির্ধারিত ভিজিএফ এর খাদ্য সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে জানান জেলেরা। তবে নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন জেলেদের শুধু খাদ্য সহায়তা নয়, নগদ অর্থ সহায়তার দাবি তাদের। অপরদিকে জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তা বন্টনের জন্য প্রকৃত জেলেদের নিবন্ধনের আওতায় আনার দাবি জানান ভুক্তভোগীরা।
উপকুলীয় বেশ কিছু মৎস্য ব্যবসায়ীর সাথে এবিষয়ে কথা বললে তারা জানায় অবরোধ শেষে পর্যাপ্ত মাছ এবং ইলিশ মৌসুমে বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়লে কয়েক মাসে জেলেদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। তবে মাছের পরিমাণ কম হলে আবারও আর্থিক সংকটে পড়তে হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জেলে ও অন্যান্য ব্যবসায়ীরা।
জেলা মৎস্য বিভাগ অনুযায়ী, পটুয়াখালীর ৭৫ হাজার নিবন্ধিত জেলেসহ লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকা এই মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। জেলার কলাপাড়া, রাঙ্গাবালী এবং মহিপুর ও আলীপুর মৎস্যবন্দরে এই পেশার মানুষের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, এই নিষেধাজ্ঞার সুফল হিসেবে মাছের উৎপাদন বাড়ার কথা। তবে সেই উৎপাদন কতটা বাড়বে, তা অনিশ্চিত। নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে সরকারি সহায়তা হিসেবে ভিজিএফের চাল বিতরণ করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নিষেধাজ্ঞার সুফল হিসেবে এবার সাগরে মাছের উৎপাদন বাড়বে এবং জেলেরা ভালো আয় করতে পারবেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।
নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন অবাধে মাছ শিকারে মাঝেমধ্যে জেল জরিমানা হলেও কতটুকু সফল হয়েছে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। সাধারন মানুষ মনে করছেন, সরকারের আরোপিত এই উদ্যোগটিতে প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার অভাব এবং অব্যবস্থাপনার গোলকধাঁধায় যেন হারিয়ে গেছে।