উপজেলার নেপচুন চা-বাগানের প্রবীণ শ্রমিক জেসমিন আক্তার জাতীয় পর্যায়ে একাধিকবার দেশসেরা চা-পাতা চয়নকারী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
৪৩ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি এক ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪৮ কেজি পর্যন্ত চা-পাতা তুলতে সক্ষম হন।
তিনি জাতীয় চা দিবস উপলক্ষে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে টানা দুবার শ্রেষ্ঠ চা-পাতা চয়নকারীর পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়াও পরবর্তী সময়েও ( ২০২৫ ও ২০২৬ সালে) তিনি এই অসামান্য অবদানের জন্য দেশসেরা চা-চয়নকারীর সম্মাননা লাভ করেন।
তিনি নিখুঁত ভাবে (‘দুই পাতা একটি কুঁড়ি’) সর্বোচ্চ গতিতে চা পাতা চয়ন করতে পারেন। তাঁর দ্রুততম কর্মদক্ষতা অনুযায়ী, তিনি এক ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪৮ কেজি পর্যন্ত চা-পাতা তুলতে পারেন।
তিনি ১৬ বছর বয়সে নেপচুন চা-বাগানে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে এই বাগানে পাতা তুলে জীবন পার করেছেন। সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে এক বছরে প্রায় ৩৪ হাজার ৯৩৭ কেজি পর্যন্ত চা-পাতা উত্তোলনের রেকর্ড রয়েছে তাঁর। দেশের ১৬৮ টি চা-বাগানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পাতা চয়নকারী শ্রমিকের স্বীকৃতি পেয়েছেন ফটিকছড়ি নেপচুন চা বাগানের শ্রমিক জেসমিন আক্তার।
সোমবার “৬ষ্ঠ জাতীয় চা দিবস-২৬ ” উপলক্ষে শ্রেষ্ঠ চা-পাতা চয়নকারী নির্বাচন প্রতিযোগীতায় অংশ নিয়ে তিনি দেশ সেরা হলেন। অনুষ্ঠানে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ঢাকায় অনুষ্ঠেয় চা-দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে তাঁর দেশসেরার পুরস্কার গ্রহন করবেন।
চা সংসদ সূত্রে জানা গেছে, চা রপ্তানির পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সরকার উৎপাদনের পাশাপাশি গুণগতমানের চা রপ্তানি বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। বিশ্বের ১৩টি দেশে চা রপ্তানি করে ২০২৫ সালে প্রায় ২৯২ মিলিয়ন টাকা আয় হয়েছে।
চা রপ্তানিতে উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যে রপ্তানিতে নগদ ভর্তুকি দেওয়া, শ্রেষ্ঠ চা রপ্তানিকারক ক্যাটাগরিতে জাতীয় চা পুরস্কার দেয়া, আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ, দেশীয় চায়ের প্রচার প্রচারণা বৃদ্ধিতে দূতাবাসগুলোকে আরও গতিশীল করাসহ নানা ধরনের উদ্যোগ রয়েছে।
জানা যায়, ১৯৬০ সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় দুই হাজার ৭০০ একর আয়তন বিশিষ্ট পাহাড়-সমতল এলাকায় গড়ে উঠে ইস্পাহানি গ্রুপের এই নেপচুন চা-বাগান। ২০০৯ সালে বৃক্ষ রোপনে দেশসেরা চা বাগান মনোনীত হয় বাগানটি। ২০২০ সালে গ্রীণ ফ্যাক্টরী এওয়ার্ড মনোনীতও হয় এ বাগান। দীর্ঘ ৬৫ বছরে এ বাগান নানা সফলতার পাশাপাশি চা উৎপাদনেও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে।
২০২৩ সালের চা পাতা চয়নে দেশসেরা চা-বাগান শ্রমিক হয়েছিলেন উপলক্ষী ত্রিপুরা। এরপরে পরপর তিনবার পাতা চয়নে দেশসেরা হলেন এই বাগানের শ্রমিক জেসমিন আক্তার। তিনি মাত্র ৩০ মিনিটে ১৩ কেজি পাতা চয়ন করেন।
জেসমিন আক্তার বলেন, ‘১৬ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসে কুমিল্লা থেকে স্বামী আবদুল বারেকের সঙ্গে চলে আসেন নেপচুন চা বাগানে। সেখানে সংসার শুরুর পরপরই স্বামীর সঙ্গে লেগে পড়েন চা বাগানের কাজে। ৪২ বছর ধরে সেই কাজই করে চলেছেন তিনি।
পরপর তিনবার দেশসেরা হতে পেরে তিনি আনন্দিত। পুত্র-কন্যা ও স্বামীসহ সংসারের ৮ সদস্য এই বাগানে কর্মরত। এতে আমি গর্বিত।’
নেপচুন চা-বাগানের ব্যবস্থাপক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘দেশের সব বাগানের মধ্যে নেপচুন চা-বাগান টানা তিন বার দেশসেরা হওয়ায় আমরা গর্বিত। জাতীয় চা দিবস উপলক্ষে প্রবর্তিত এই পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চা পাতা চয়নকারী ক্যাটাগরিতে জেসমিন আক্তার পরপর তিনবার এ পুরস্কার পান। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ ধারা অব্যাহত রাখতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাব।’
রিয়াজ উদ্দিন আরোও বলেন, ‘জেসমিনের বয়স এখন ৫৮ বছর, তিনি প্রতি ঘণ্টায় ৪৯ কেজির মতো চা পাতা তুলতে পারেন। গত এক বছরে তিনি পাতা তুলেছেন ২৬ হাজার ২১৭ কেজি। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এ পুরস্কার পেয়েছেন। এতে বাগান সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি দেশও চায়ের অগ্রযাত্রার জন্য গর্বিত হলো।’