উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও কারামুক্তি মেলেনি গুরুতর অসুস্থ বিশিষ্ট সাংবাদিক আজহার আলী সরকারের (৫৭)। উল্টো একটি নতুন মামলায় ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ (গ্রেপ্তার) দেখিয়ে তাঁকে হাসপাতাল থেকে পুনরায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে লিভার সিরোসিস ও কিডনি বিকলতাসহ একাধিক জীবনঘাতী রোগে আক্রান্ত এই সাংবাদিকের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে।
উন্নত চিকিৎসার পরিবর্তে তাঁকে হাসপাতাল থেকে কারাগারে ফেরত পাঠানোয় তাঁর পরিবার গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
পারিবারিক ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, রমনা মডেল থানায় দায়ের করা যে মামলায় সাংবাদিক আজহার আলী সরকারকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল, দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে সম্প্রতি মহামান্য হাইকোর্ট থেকে তিনি জামিন লাভ করেন।
আইনি নিয়ম অনুযায়ী তাঁর কারামুক্তিতে কোনো বাধা থাকার কথা ছিল না। কিন্তু জামিনের আদেশ কার্যকর হওয়ার আগেই কারা কর্তৃপক্ষ আরেকটি মামলায় তাঁকে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখায়।
এরই প্রেক্ষিতে, গত ২৯ এপ্রিল থেকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বাংলাদেশ শেখ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (—সাবেক পিজি হাসপাতাল)-এর প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন থাকা আজহার সরকারকে তড়িঘড়ি করে পুনরায় কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের গঠিত উচ্চপর্যায়ের মেডিকেল বোর্ডের একাধিক রিপোর্ট অনুযায়ী, আজহার আলী সরকার লিভার সিরোসিস, তীব্র কিডনি জটিলতা এবং ফুসফুসের অ্যাজমা বা হাঁপানিজনিত শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, তাঁর জীবন বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে অন্তত দুটি বড় ধরনের অপারেশন প্রয়োজন।
এর আগে মে ও জুন মাসে তিন দফায় তাঁর অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও রক্তের হিমোগ্লোবিন ও প্লাটিলেটের মাত্রা অতিরিক্ত কম থাকায় এবং শারীরিক অনুপযুক্ততার কারণে তা স্থগিত করতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা। তীব্র রক্তস্বল্পতা দূর করতে তাঁকে এ পর্যন্ত ৬ ব্যাগ ‘এবি পজিটিভ’ (AB+) রক্ত দেওয়া হয়েছিল। এই জটিল মুহূর্তে তাঁকে চিকিৎসার মাঝপথে প্রিজন সেল থেকে পুনরায় কারাগারে নিয়ে যাওয়ায় তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে, যা তাঁর জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
‘মিথ্যা মামলায়’ দীর্ঘ কারাবাস ও পরিবারের আর্তনাদ : আজাহার আলী সরকারের পরিবারের দাবি, গত ১০ অক্টোবর, ২০২৫ সন্ধ্যায় ডিবির একটি দল বনশ্রীর বাসভবন থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যায় এবং পরদিন রমনা থানার একটি রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। দীর্ঘ এই কারাবাসের সময়েই সঠিক চিকিৎসার অভাবে তাঁর শরীরে এই দীর্ঘস্থায়ী ও মরণব্যাধি রোগগুলো বাসা বাঁধে। শুরু থেকেই সাংবাদিক আজহার সরকার তাঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট বলে দাবি করে আসছেন।
বর্তমানে জামিন পাওয়ার পরও মুক্তি না দিয়ে নতুন মামলায় জড়ানো এবং হাসপাতাল থেকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় তাঁর পরিবার ভেঙে পড়েছে। আজাহার সরকারের স্ত্রী, ৩ সন্তান এবং আত্মীয়-স্বজনরা চরম দুশ্চিন্তা ও মানসিক ট্রমার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা : এমন চরম অমানবিক, নিষ্ঠুর ও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে সাংবাদিক আজহার আলী সরকারের মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা ও জরুরি উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি এবং জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই সাথে পরিবারটি দেশবাসীর কাছে তাঁর দ্রুত আরোগ্য ও মুক্তির জন্য দোয়া চেয়েছেন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং একজন অসুস্থ নাগরিকের চিকিৎসার অধিকার রক্ষার্থে সাংবাদিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরাও আজহার সরকারের এই ‘শোন অ্যারেস্ট’-এর সংস্কৃতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং অবিলম্বে তাঁর মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবি তুলেছেন তার স্ত্রী।