একজন ডা. কামরুলের হাতেই হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন

জাতীয় সুস্থ্ থাকুন

ডেস্ক রিপোর্ট: দেশের একজন শল্যচিকিৎসক মো. কামরুল ইসলাম যার হাত ধরে এক হাজারের বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন। দেশে এ পর্যন্ত যত কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়েছে, এর এক-তৃতীয়াংশ তাঁর হাত দিয়ে হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা একে বড় ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন।

মানবসেবার মহান ব্রত থেকেই চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন অধ্যাপক কামরুল ইসলাম। পেছনে ছিল মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পিতার অনুপ্রেরণা। সেই পথ ধরে নিজের পেশাকে কেবল সামাজিক ও আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভের সিঁড়ি বানাননি তিনি। বরং দেশের দরিদ্র কিডনি রোগীদের জন্য নামমাত্র মূল্যে কিডনি প্রতিস্থাপন ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের জন্য তৈরি করেছেন বিশেষায়িত এক প্রতিষ্ঠান।

সম্প্রতি ১ হাজার কিডনি প্রতিস্থাপনের মাইলফলক ছুঁয়েছেন অধ্যাপক কামরুল ইসলাম ও তার প্রতিষ্ঠান শ্যামলীর সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস (সিকেডি) অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল। গরীব রোগীদের কম মূল্যে কিডনি প্রতিস্থাপন ও চিকিৎসার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৪ সালে এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেন কামরুল ইসলাম।

করোনা মহামারির সময় সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার প্রায় বন্ধ থাকলেও কিডনি প্রতিস্থাপন বন্ধ রাখেননি তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে মহামারির সময়ে ২৫৫টি কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

রাজধানীর শ্যামলীতে হাসপাতালটি যাত্রা শুরু করে ২০০৭ সালে। তখন থেকে কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু। প্রতিস্থাপন শল্যবিদ বা ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন কামরুল ইসলাম ১৯ অক্টোবর এক হাজার কিডনি প্রতিস্থাপনের মাইলফলক স্পর্শ করেন।

এ ব্যাপারে দেশের বিশিষ্ট কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ও কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘বিপুল সংখ্যায় কিডনি প্রতিস্থাপন করার জন্য অধ্যাপক কামরুল ইসলামকে অভিনন্দন জানাই। তাঁর এই সাফল্য নবীন শল্যচিকিৎসকদের অনুপ্রাণিত করবে। তাঁকে অনুসরণ করে দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কিডনি প্রতিস্থাপনে তৎপর হবে বলে আশা করি।’

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কিডনি প্রতিস্থাপন একটি জীবনদায়ী শল্যচিকিৎসা। মানুষের দুটি কিডনি থাকে। জটিল ও দীর্ঘদিন কিডনি রোগে ভুগলে মানুষের কিডনি অকেজো হয়ে যায়। তখন অন্যের শরীর থেকে একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা হয়। কিডনি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ দাবি করেন, একটি কিডনি নিয়েও মানুষ স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারেন।

১৯৮২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) দেশে প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু হয়। এর বাইরে সরকারি হাসপাতালের মধ্যে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়। বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে আছে সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল, বারডেম, কিডনি ফাউন্ডেশন, পপুলার হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতাল, এভারকেয়ার হাসপাতাল। তবে সব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কিডনি প্রতিস্থাপিত হয় না। ঢাকার বাইরে শুধু চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুটি কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। বিভিন্ন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

কিডনি প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন, দেশে এমন রোগীর সংখ্যার তুলনায় প্রতিস্থাপন করার সুযোগ-সুবিধা কম। গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায়, দেশের বহু মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য বিদেশে যান। বিদেশে এই চিকিৎসার খরচও অনেক বেশি। প্রতিবেশী দেশ ভারতে গেলে সব মিলে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ হয়। অনেকে প্রতারণারও শিকার হন।

সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে একটি কিডনি প্রতিস্থাপন চিকিৎসায় নেওয়া হয় ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। এই খরচের মধ্যে কিডনিগ্রহীতা ১৪ দিন আইসিইউতে থাকতে পারেন, কিডনিদাতাও প্রয়োজনীয় পাঁচ-ছয় দিন হাসপাতালে থাকতে পারেন। ওষুধের জন্য বাড়তি খরচ করতে হয় না।

২৩ অক্টোবর রাতে ওই হাসপাতালে কথা হয় অধ্যাপক কামরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মধ্যবিত্ত বা নিু মধ্যবিত্তের কথা মাথায় রেখে আমি কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করছি। যাঁদের অর্থকড়ি আছে, সামর্থ্য আছে, তাঁরা বিদেশে গিয়ে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করাতে পারেন। যাঁরা যেতে পারেন না, আমি তাঁদের জন্য কাজ করছি।’

অধ্যাপক কামরুল ইসলামের সঙ্গে চিকিৎসক-নার্সদের একটি দল কিডনি প্রতিস্থাপনে যুক্ত থাকে। যেমন হাজারতম কিডনি প্রতিস্থাপনে যুক্ত ছিলেন ১৪ জন। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিস্থাপনের সময় একজন চিকিৎসক কিডনিদাতার শরীরে অস্ত্রোপচার করেন, একজন চিকিৎসক রোগী বা কিডনিগ্রহীতার শরীরে অস্ত্রোপচার করেন।

কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি একাই কিডনি নেওয়া ও সংযোজন করেন। প্রতিটি অস্ত্রোপচারে গড়ে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। হাসপাতালে এখন সপ্তাহে তিনটি কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়। এই সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে।

মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন (সংশোধন) আইন, ২০১৮-এ অঙ্গপ্রত্যঙ্গগ্রহীতার ও দাতার প্রত্যেকের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ করার কথা বলা আছে। সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিটি কিডনি প্রতিস্থাপনের সঙ্গে জড়িত গ্রহীতা ও দাতার প্রত্যেকের তথ্য রেজিস্টারে লেখা হয় ও সংরক্ষণ করা হয়। বছর শেষে তাঁরা এই তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখায় জমা দেন। কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে সাফল্যের হার ৯৫ শতাংশ।

সাফল্যের হার: সিকেডি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অধ্যাপক কামরুল ও তার দল এ পর্যন্ত যে ১ হাজার ৪টি কিডনি প্রতিস্থাপন করেছে, তার মধ্যে মাত্র ৭টি কিডনি কাজ করেনি। প্রতিস্থাপনের পর বিকল হয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ। অর্থাৎ সফলতার হার ৯৬ শতাংশ। এছাড়া, মহামারির মধ্যে কিডনি প্রতিস্থাপনের পর করোনা আক্রান্ত হয়ে ২ জন মারা গেছেন। আর কিডনি প্রতিস্থাপনের ২ দিন পর হার্ট অ্যাটাক হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১ রোগীর।

ব্যক্তিজীবন: অধ্যাপক কামরুল ইসলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের কে ৪০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। ১৯৮২ সালে তখনকার ৮টি মেডিকেল কলেজের সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস অব এডিনবার্গ থেকে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাবা আমিনুল ইসলাম পাকশী ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার ‘অপরাধে’ স্থানীয় রাজাকার ও বিহারীরা তাকে হত্যা করে।

অধ্যাপক কামরুল ১৯৯৩ সালে স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন। তিনি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। প্রথমবারের মতো সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপনের কাজ করেন ২০০৭ সালে। ২০১১ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে প্রতিষ্ঠা করেন সিকেডি হাসপাতাল।

সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দেশের কিডনি চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত যে আইন আছে, তাতে সার্জনদের প্রোটেকশন অনেক কম। এই অর্থে যে, রিলেশনশিপ যদি ঠিক না থাকে তাহলে সার্জনদের দায়ী করা হয়।

 

তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক না বেঠিক সেটা নির্ধারণ করা তো সার্জনদের দায়িত্ব না। তার দায়িত্ব অস্ত্রোপচার করা ও রোগীকে সুস্থ করে তোলা। অর্থাৎ চিকিৎসার জন্য সার্জন দায়ী থাকতে পারেন। কিন্তু আইনে রিলেশনশিপ ঠিক না থাকলে সার্জনের লাইসেন্স বাতিল ও হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের মতো বিধান আছে। এই সম্পর্ক নির্ধারণের জন্য সরকারের একটা কর্তৃপক্ষ থাকলে ভালো হয়।’

এছাড়া, মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে কিডনি নিয়ে প্রতিস্থাপনের কাজে বাংলাদেশ তেমন অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি মন্তব্য করে অধ্যাপক কামরুল বলেন, ‘আইসিইউতে যারা মারা যান, সেই সব মৃত ব্যক্তিদের কিডনি যদি ভালো থাকে, তাহলে তা দিয়ে ২ জন রোগীকে সুস্থ করা যায়। এই ব্যাপারটাতে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি।’

আর নিজের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে মানবদরদী এই চিকিৎসকের মূল্যায়ন হচ্ছে, ‘একটা মানুষের চলার জন্য খুব বেশি পয়সা তো লাগে না। যে সম্মান আমি পেয়েছি, মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি, এটাই তো অমূল্য। এটা তো আর টাকা দিয়ে পাওয়া যাবে না।’

৫৬ বছর বয়সী এই অধ্যাপক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, ‘প্রতিস্থাপনের পর কিডনিদাতাদের প্রতি নজর কম থাকে। তাই তাঁরা যেন ভালো থাকেন, সে জন্য কিছু করার ইচ্ছা আছে। ভবিষ্যতে এই হাসপাতালে কিডনিদাতারা বিনা মূল্যে সব ধরনের কিডনি রোগের চিকিৎসা পাবেন। দাতাদের কারও শরীরে কিডনি সংযোজনের দরকার পড়লে তা-ও বিনা মূল্যে করা হবে।’

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *