আগের দিন মানুষের সুপেয় ও বিশুদ্ধ পানি পানের জন্য কুয়া বা ইন্দিরা, পুকুর, জলাশয়, নদী-নালার পানিই ছিল একমাত্র ভরসা। সমাজে যারা বিত্তবান তারা কুয়া বানাতেন। ১০ থেকে ১৫ ফুট গোল গর্ত, ৫০ থেকে ৬০ ফুট নিচ পর্যন্ত মাটি খুঁড়ে ইন্দারা, কুয়া বা কুপ তৈরি করা হতো। পুরোনো দিনে জমিদার, রাজা, বাদশা রানীরা তাদের প্রজাদের পানির ব্যবস্থা করে দিতেন পুকুর, কুয়া বা ইন্দারা স্থাপনের মাধ্যমে। ষাটের দশকেও যাদের জন্ম, তাদের অভিজ্ঞতায় সুপেয় পানির অভাব, পুকুরের জলাশয়ের পানি পান করে কলেরা, টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকার কথা। কুয়া বা ইন্দারা সারাবিশ্বে পানীয় জলের একমাত্র উৎস হিসেবে জানত মানুষ। আমাদের নবী করিমের (সা.) বিভিন্ন বর্ণনায় কুয়া চলে এসেছে।
নবী ইউসুফ (আ.)-কে ভাইদের দ্বারা কুপে নিক্ষেপের কাহিনি সর্বজন বিদিত। তার মানে কুয়া বা ইন্দারা অনেক ঐতিহ্যপূর্ণ পুরোনো এক সংস্কৃতি। যার মূল্যবান ইতিহাস পাওয়া যায়। দৈনন্দিন কাজে পান করা ছাড়াও পানির বহুবিদ ব্যবহার অস্বীকার করা যায় না। গ্রীষ্মকালে পুকুর, খাল, বিল, নদী-নালা শুকিয়ে যেত। তখন এসবের পানি নোংরা হয়ে যেত, যা পান করার মতো থাকত না। ফলে কুয়া নির্মাণ করার প্রয়োজন দেখা দিত। যারা বিত্তবান, তারা সান বাঁধানো বিশাল পানির ইন্দারা বানিয়ে নিতেন।
নওগাঁর আত্রাই উপজেলা সহ দেশের প্রায় সকল এলাকা থেকে ক্রমেই হারিয়ে বিলুপ্তির পথে কুয়া।আবহমান গ্রাম বাংলার একসময়ের অপরিহার্য কুয়া বা ইন্দিরা।নতুন প্রজন্মের অধিকাংশরাই এই কুয়া কি তারা বলতেই পারে না।আধুনিকতার ছোঁয়াতে ঐতিহ্যের কুয়া এখন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এখনকার ও আগামীর প্রজন্ম বই ও ইতিহাসের পাতায় বা জাদুঘরে খুঁজে পাবে কুয়া বা ইন্দিরা। ধীরে ধীরে কুয়া এখন ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে চাপা পরে যারার উপক্রম। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেখানোর জন্য বাংলাদেশের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ কুয়া বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষণ করা জরুরি।তবে,শুনেছি দেশে এখনো কোন কোন এলাকায় কুয়ার পানি ব্যাবহার হচ্ছে। এর সংখ্যা একেবারেই অনুল্লেখযোগ্য। কেউ বাপ দাদার স্মৃতি বিজরিত কুয়া টিকিয়ে রাখতে এখনো ব্যাবহার করছেন। কেউবা ঐতিহ্য ধরে রাখতে একান্ত সখের বসে। এখন সকল এলাকাতেই সবার বাড়িতে টিউবওয়েল রয়েছে। এর মধ্যে অনেকের বাড়িতে বিদ্যুৎ চালিত মোটার রয়েছে। ফলে কুয়া হারিয়েছে তার গুরুত্ব।
নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে একসময় এই কুয়ার ব্যাপক প্রচলন ছিল।উপজেলা সাহাগোলা ইউনিয়নের ভবানীপুর জমিদার বাড়িতে প্রাচীন দালান বাড়ির পাশেই বিশালাকার কুয়া রয়েছে। আজো সেই কুয়া স্মৃতি বহন করে চলছে। এছাড়াও বিভিন্ন জমিদার বাড়িতেও কুয়া রয়েছে লতা পাতায় ঘেরা জরাজীর্ণ।
এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য এলাকার প্রবীণদের সাথে কথা হয়। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এক সময় নিরাপদ সুপেয় পানির অভাব মিটানো হতো। গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে কুয়া থাকত। একটি কুয়া থেকে আশপাশের বাড়ির মানুষরাও পানি নিয়ে যেত লাইন ধরে। নারীরা কোমরে মাটির কলশি নিয়ে পানি নিতে আসত। মাটির হাড়ি বা টিনের তৈরি বালতিতে রশি লাগিয়ে বাঁশের মধ্যে বেঁধে কুয়ার ভিতরের গর্তে ফেলে পানি উঠানো হয়। আর এসব পানি পান করা এবং রান্না সহ সকল ধরনের কাজ করা হতো। তখনকার সময়ে মেয়ে বিয়ে দেওয়া হলেও দেখা হতো ছেলের বাড়িতে পানির কুয়া আছে কি না।
বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কিছু কিছু এলাকায় কুয়া এখনো আছে কয়েকটা। কিন্তু তা ব্যাবহার করা হয় না। যে কটা আছে তাও সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ হিসাবে তারা বলছেন, এভাবে কুয়া রাখা নিরাপদ নয়, ছোট বাচ্চারা ভিতরে পড়ে যেতে পারে। আর এভাবেই স্মৃতির পাতা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে কুয়া। সরেজমিনে সাহাগোলা ইউনিয়নের জমিদার বাড়িতে জীর্ণ শীর্ণ একটি
কুয়া দেখতে পাওয়া যায়। দীর্ঘ দিন থেকে সেটি আর ব্যবহার করা হয় না। কুয়াটি ময়লা আবর্জনা ফেলে ভরাট করা হয়েছে । জমিদার বাড়ি এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি বিমল শীল (৭৭) বলেন,আমাদের সময় কুয়াতে পানি ছিল। সেই পানি আমরা ব্যবহার করতাম। সময়ের পরিক্রমাই এবং জীবন যাপনের পরিবর্তনে কুয়া এখন রুপকথার গল্প বর্তমান তার স্থান দখল করেছে আধুনিক গভীর অগভীর নলকূপ। যে দু একটি কুয়া ছিল তাও দুর্ঘটনা এড়াতে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন-কুয়ার পানি দিয়ে গোসল করলে খুবই আরাম পাওয়া যেত। পানি খুবই ঠান্ডা ও শীতল থাকায় গরমের সময় খাবার ও গোসলের জন্য খুবই স্বস্তি দায়ক ছিল। তাছাড়া স্বচ্ছ ঝকঝকে টলমল কুয়ার পানি পানের জন্য ছিল নিরাপদ।