এম. এ. বাকী বিল্লাহ
গণতন্ত্র তখনই কার্যকর হয়, যখন রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের প্রত্যাশা, মতামত ও প্রতিনিধিত্ব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশসহ বহু এককক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় গণতন্ত্রে দীর্ঘদিন ধরেই একটি সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে—ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। এ প্রেক্ষাপটে, ‘দুইকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা’ তথা Bicameral Legislature প্রতিষ্ঠার দাবি দিনদিন জোরালো হচ্ছে। তবে প্রশ্ন হলো দুই কক্ষে কী ধরণের নির্বাচনী ব্যবস্থা কার্যকর হবে? অনেকের ধারণা, “প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR)” পদ্ধতিটি নিম্নকক্ষে প্রবর্তন করলে জনগণের ভোটের সঠিক প্রতিফলন ঘটবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে—PR পদ্ধতি নিম্নকক্ষের তুলনায় উচ্চকক্ষে বাস্তবায়নই বেশি যৌক্তিক ও ফলপ্রসূ।
বাংলাদেশে এককক্ষীয় সংসদ: একটি সীমাবদ্ধ কাঠামো। এই কাঠামোয় ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে যিনি ভোটের হিসাব অনুযায়ী সর্বাধিক ভোট পান, তিনিই নির্বাচিত হন যাকে বলা হয় First past the post (FPTP) পদ্ধতি। এতে একটা বড় সমস্যা হলো—কোনো দল হয়তো জাতীয়ভাবে ৩০-৪০% ভোট পেয়েছে, কিন্তু আসনের ৮০% দখলে রাখতে পারে। ফলে সংসদে প্রতিপক্ষ বা বিকল্প মত দাঁড়ানোর মতো যথেষ্ট সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক শক্তি থাকে না। সেক্ষেত্রে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে-বিবেচনায় Bicameral Legislature বা একটি বিকল্প কাঠামো রাষ্ট্রে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে অত্যন্ত সহায়ক। এই কাঠামোয় দুইকক্ষীয় আইনসভায় সাধারণত দুটি কক্ষ থাকে: নিম্নকক্ষ ( Lower House): সরাসরি ভোটে গঠিত, সরকার গঠনের মূলভিত্তি। উচ্চকক্ষ (Upper House): পরোক্ষভাবে নির্বাচিত বা মনোনীত, আইন পর্যালোচনা, নীতিগত ভারসাম্য ও জাতীয় পরিপ্রেক্ষিত রক্ষায় নিয়োজিত। ভারতীয় সংসদের রাজ্যসভা, যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডস, যুক্তরাষ্ট্রের সেনেট এবং অস্ট্রেলিয়ার সংসদে এই কাঠামো কার্যকরভাবে বিদ্যমান।
আসুন এখন জানি, PR পদ্ধতির মূল লক্ষ্য কী?
প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে জাতীয় বা আঞ্চলিক ভোটের শতাংশ অনুযায়ী দলগুলো সংসদে আসন পায়। এতে রাজনৈতিক বৈচিত্র্য, মতপার্থক্য এবং গোষ্ঠীগত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। ছোট দল, নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে জাতীয় আইনসভায় প্রবেশের পথ সুগম হয়। এখন প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে কেন নিম্নকক্ষে PR নয়?
কেনো নিম্নকক্ষে পিআর নয়-
সরকার গঠনের জটিলতা বাড়ে: PR ব্যবস্থায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন, ফলে বারবার জোট সরকার গঠনের প্রয়োজন পড়ে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেয় (যেমন: ইসরায়েল, ইতালি)। ভোটারদের জন্য জটিলতা: সরাসরি ভোটে ঋচঞচ পদ্ধতি সহজবোধ্য ও পরিচিত। চজ পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে জটিল এবং অনেক ভোটার তাতে বিভ্রান্ত হতে পারেন। সরকারের জবাবদিহিতার হ্রাস: চজ ভিত্তিক সরকার বহু দলের সমন্বয়ে গঠিত হলে দায়বদ্ধতা অনেক সময় ক্ষীণ হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে উচ্চকক্ষে PR কেন প্রযোজ্য? উচ্চকক্ষে পিআর প্রয়োজন কারণ- প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য: জাতীয় পর্যায়ের দল ছাড়াও অঞ্চলভিত্তিক ছোট দল, সুশীল সমাজ, নারীবাদী সংগঠন, পরিবেশবাদী গোষ্ঠী, পেশাজীবী সংগঠন—সবাইকে যুক্ত করা সম্ভব চজ ভিত্তিক উচ্চকক্ষে। বিল পাসে দ্বৈত চিন্তা ও যাচাই: আইন পাশ হওয়ার আগে চজ-ভিত্তিক উচ্চকক্ষে পুনর্বিবেচনা হলে সেখানে রাজনৈতিক পক্ষপাত কমে এবং বিষয়ভিত্তিক গভীর বিশ্লেষণ সম্ভব হয়। সাংবিধানিক ভারসাম্য: চজ ভিত্তিক উচ্চকক্ষ একটি চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স তৈরি করে, যা এককেন্দ্রিক সরকারের দমননীতি বা ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে লক্ষ্য করলে দেখা যায়-অস্ট্রেলিয়া: উচ্চকক্ষে (Senate) PR পদ্ধতি প্রবর্তনের ফলে নারী, পরিবেশবাদী দল (Green party), আদিবাসী প্রতিনিধিরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। দক্ষিণ আফ্রিকা: উভয় কক্ষেই চজ ব্যবস্থায় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে ঐতিহাসিক বৈষম্য কমিয়েছে।
জার্মানি: সংমিশ্রিত পদ্ধতিতে (Mixed Member PR) উচ্চকক্ষে বাস্তববাদী ও ব্যালান্সড সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়েছে। এখন আলোচনা করা যেতে পারে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা কীভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের উচ্চকক্ষ গঠনে-
★★ নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ভোট-ভিত্তিক পিআর নির্বাচন।
★★ সংখ্যালঘু, আদিবাসী, নারী ও পেশাজীবীদের জন্য কোটাসহ প্রতিনিধিত্ব।
★★ জেলা বা বিভাগভিত্তিক সমবন্টন নিশ্চিত করা।
এতে করে আইন পাসের পূর্বাবস্থা যাচাই, সরকারি বিলের নৈতিকতা যাচাই এবং মানবাধিকার, গণমাধ্যম ও সংবিধান লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন উত্থাপন করা সহজতর হবে।
সবশেষে বলা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে যেভাবে সংসদ একমুখী হয়ে পড়েছে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিষ্ক্রিয় এবং বিরোধী কণ্ঠ দুর্বল—এই প্রেক্ষাপটে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা আর কেবল একটি ধারণা নয়, বরং এটি গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের অপরিহার্য পথ। নিম্নকক্ষে চজ বাস্তবায়ন জটিলতা তৈরি করতে পারে, কিন্তু উচ্চকক্ষে চজ পদ্ধতি একটি ভারসাম্যদায়ী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমালোচনামূলক রাষ্ট্রচিন্তার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে। এখন সময়—এককেন্দ্রিক শাসন কাঠামো থেকে সরে এসে এমন একটি দ্বিকেন্দ্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার, যেখানে নীতি হবে জাতীয়, আর চিন্তা হবে বৈচিত্র্যময়।
-এম. এ. বাকী বিল্লাহ
বিএসএস ও এমএসএস, রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।