শেখ হাসিনার পতনের পর কমেনি বাংলাদেশের মানুষের দুর্ভোগ। বেড়েই চলেছে নিত্য প্রয়োজনী পণ্যের দাম। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও ঠিক হয়নি। বাড়ছে বেকারত্ব। বিশ্বব্যাংকও উদ্বিগ্ন। তারা বলছে, অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও সময় লাগবে। এই মুহূর্তে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার নানাদিকে ব্যস্ত। একদিকে বেকারত্ব বাড়ছে। মানুষের কাজ চাই। অন্যদিকে, এখনই কমাতে হবে জিনিসের দাম। জরুরি অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকে প্রয়োজন। কিন্তু এসব নিয়ে সরকারের কাজ কোনো পর্যায়ে আছে, মানুষের মাঝে তার স্পষ্ট কোনো ধারণা নাই। তাই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা ছাত্র-জনতার মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে ক্রমশই।
দেশের এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই কেন জানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দিবস পরিবর্তন। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ, সংবিধান দিবসসহ আরও ৮ দিবস বাতিল করলো সরকার। এ নিয়ে একদল মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভেও ফেটে পড়েছে। তাদের বক্তব্য, দেশের এতো সমস্যা, মানুষের জীবনে ত্রাহি অবস্থা। সেদিকে নজর না দিয়ে, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে নজর না দিয়ে কেন এদিকে বেশি নজর? একদিকে চলছে ভারত বিরোধিতা, আবার সেই ভারত থেকেই পণ্য এনে বাজার ঠিক রাখার চেষ্টা হচ্ছে। মানুষ চাইছেন নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচনের কোনো রোডম্যাপ এখনও হয়নি। মানুষ আছে অন্ধকারে।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটের অক্টোবর সংখ্যায় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নির্বাচন নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি দেশের অস্থিরতার ভাবনাও রয়েছে সেই প্রতিবেদনে। আকাশছোঁয়া জিনিসের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যর্থতার পাশাপাশি নতুন করে বিনিয়োগের অভাবে কর্মসংস্থানের অভাব ভাবিয়ে তুলছে অর্থনীতিবিদদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় একদিকে দেশের বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান কমেছে, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে। খাদ্য মূল্যষ্ফীতি প্রতিরোধ আর নতুন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিই অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিন্তু সেদিকে নজরই দিচ্ছে না কেউ।
পণ্যমূল্যের দাম এখন সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। ডিম থেকে কাঁচামরিচ, ভারত থেকে আমদানি করে সামাল দিতে হচ্ছে। কিন্তু তাতেও সুফল মিলছে না। মজুতদাররা রাতারাতি দলবদল করে সবজিনিসেরই দাম বাড়িয়েছে। সরকার বিবৃতি দিলেও কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে, চলতি অর্থ বছরের শেষে কিছুটা কমলেও মূল্যস্ফিতি থাকবে ৯ শতাংশের কাছাকাছি। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা জানান, চলতি বছরে খাদ্যের দাম ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে হচ্ছে ৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ও ভুটানে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুলায়ে সেকের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা ও খেলাপি ঋণের চাপ আগামী দিনগুলিতে আরও ভয়ঙ্কর চেহারা নিতে পারে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশের ঋণের অবস্থা নাজুক। বিশ্বব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন কমছে। জিডিপি আগের মতো অবস্থায় ফিরতে অনেকটা সময় লাগবে। ফলে চাপে থাকবে গোটা দেশের অর্থনীতি।
গোটা দেশে ৫ শতাংশের সামান্য বেশি মানুষের জন্য রয়েছে সরকারি চাকরির সুযোগ। বিশ্বব্যাংকের অনুমান, রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা না থাকায় বড় কোনও বিনিয়োগ আসবে না বাংলাদেশে। আর নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ বাড়বে। চাকরি হারানো ও প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ায় এ বছর দেশের প্রায় ১২ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হতে পারে। বর্তমান সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আর্থিক খাতে সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করারও তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাদের মতে, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। আর এরজন্য চাই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এরই মধ্যে আড়াই মাস অতিক্রম করেছে। কিন্তু এখনও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, চাঁদাবাজি, কালো বাজারি কোনো কিছুই বন্ধ হয়নি। এখনও স্বাভাবিক হতে পারেনি পুলিশ। সেনাবাহিনীর ওপরে নির্ভর করতে হচ্ছে সবাইকে। এ অবস্থার পরিত্রাণ দরকার। অস্থিরতা না কমলে তা হবে সরকারের জন্য বুমেরাং। অনেক আশা ভরসা নিয়েই এই সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। জনগণের আশা যদি পুরণ না হয়, তবে সেটা হবে আরেকবার আশাভঙ্গের মতো আঘাত। দেশ নিয়ে এই আশা ভঙ্গ মানুষের মনে জিইয়ে থাকুক, কোনো সুনাগরিক হিসেবে আমি তা চাইনা।