সমাজে কিশোর বয়সে বিয়ের ( বাল্যবিয়ে) বেশি প্রবণতা দেখা যায় দরিদ্র পরিবারে। এধরনের সমাজে অসচেতনতার পাশাপাশি যেই বিষয়টা উল্লেখযোগ্য তাহলো “কন্যা বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হওয়া সহসা। পারিপার্শ্বিক আরো বিশেষ কতকগুলো কারণ রয়েছে বাল্যবিয়ের পেছনে। যেমন-বখাটেদের পথেঘাটে মেয়েদের উত্যক্ত করা, পরিবার মান ক্ষুণ্ন হওয়া, প্রেম করে পালানোর ভয়, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, ধর্মীয় বাঁধা, বাল্যবিবাহ আইন সম্পর্কে ধারণা না থাকা ইত্যাদি।
বাল্যবিয়ে প্রধানত যেই কারণে রোধ করা যাচ্ছে না তার মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হলো- মেয়েদের মতামতকে প্রাধান্য না দেওয়া। অপ্রাপ্ত বয়স্ক মহিলার ক্ষেত্রে এ প্রবণতা বেশি। গ্রামীণ পরিবেশে দেখা যায় পরিবারের কর্তা তথা মেয়ের বাবা মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে কিনা সেই চিন্তা করে না। সম্বন্ধ আসলে সেটা আর হাতছাড়া করতে চায় না সহজেই। জায়গাজমি বিক্রি করে, ঋণভারে জর্জরিত হয়ে মেয়ে বিয়ে দিয়ে দিলো। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মেয়ের বাবা ঋণমুক্ত না হওয়ার আগেই বিবাহিত সেই মেয়ে সন্তানের মা হয়। অল্প বয়সে মা হওয়ার কারণে মা-সন্তানের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। ভাগ্য খারাপ হলে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে এ শ্রেণির পরিবারের সন্তানদের।
মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হলো কিনা, মেয়ের মত বিয়েতে আছে কিনা– এধরনের সমস্যাকে যদি বিবেচনায় এনে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় তাহলে বাল্যবিবাহ রোধে উল্লিখিত দুইটি কারণই যথেষ্ট হতে পারে। সমাজের ভালোমন্দের দায়িত্বে যারা থাকেন তাদের মধ্যেও প্রতিরোধের মনমানসিকতা থাকতে হবে। অনেক সময় সমাজ পরিচালনাকারীদের মতামতকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে ঘটে বিপত্তি। আবদুল বললো, সম্বন্ধ ভালো হবে, তাই আমি রাজী হয়ে গেলাম। এ সমস্ত সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ধর্মীয় কুসংস্কারের কারণেও কিশোর বয়সে বিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ঠেকানো যাচ্ছে না। তবে সুখের বিষয় হলো, সমাজের মানুষ এখন কিছুটা হলেও ধর্মীয় কুসংস্কারের গন্ডি থেকে বের হয়ে আসছে। দরিদ্র অশিক্ষিত পরিবারের বাবা-মা’রা বিয়ে সংক্রান্ত ব্যাপারে ছেলেমেয়ের মতামত জানছে এবং সিদ্ধান্তে যাচ্ছে বলে জানালেন এক সুপরিচিত সমাজসেবক। তিনি আরও জানালেন, এ ধরনের পরিবারের সংখ্যা সমাজে সন্তোষজনক পর্যায়ে নয়।
তবে কিশোর বয়সে বিয়ের ব্যাপারে কয়েকজনের মতামত জেনে যেই ধারণা পাওয়া গেলো তা এ রকম – প্রতিটি পরিবারের বাবা-মা ছেলেমেয়ের ব্যাপারে থাকে উৎকন্ঠায়। বিবাহযোগ্যা ছেলেমেয়ের বাবা-মা’র অবস্থা আরো খারাপ। তারা মানসম্মান বাঁচানোর তাগিদে ছেলেমেয়ের বিয়ের সুনির্দিষ্ট সময়ের আগেই বিয়ে দিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠে।
এ ধরনের মনমাসিকতার কারণেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিপত্তি ঘটে থাকে। সকলে চাইবে তাদের ছেলেমেয়ে সুখে শান্তিতে থাকুক। বাবা-মা’কে সতর্কতা অবলম্বন করে ছেলেমেয়ের সাথে বন্ধু সুলভ করলে পরিবারে শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি হয়। সোহাগী এবং কঠোর মনোভাব– এই দুইটি বিষয়ে সচেতন থাকলে বিপত্তি ঘটার সম্ভাবনা কমে আসতে পারে। অতি সোহাগের কারণে ছেলেমেয়েরা সুযোগ নিতে চায়, আবার অতি কঠোরতার কারণে সন্তানরা বেঁকেও যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে “শাসন করা তারই সাজে, সোহাগ করে যেগো” নীতি অবলম্বন করা গেলে প্রতিটি পরিবারে শান্তির বাতাস বইবে।
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে যেতোই আইন করা হোক না কেনো, উল্লিখিত কারণগুলোর বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা দরকার। আইন থেকে কি হবে যদি সেই আইনের প্রয়োগ না থাকে। যারা আইন প্রয়োগের দায়িত্বে আছে তাদের আরো সক্রিয় হতে হবে। সব কথার মূলে রয়েছে একটি কথা- তা হলো-“সচেতনতা”। সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হলে সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।
সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গ্রাম শহরের শিক্ষিত, সচেতন তরুণ, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় নেতারা দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু কিছু বেসরকারি সংগঠনও এ ব্যাপারে প্রচারমূলক কাজ করছে। তবে এ ক্ষেত্রে যেটি প্রয়োজন তা হলো- শিক্ষার প্রসার, বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও তাদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার প্রচেষ্টা নিলে কিশোর বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা কমবে। সেই সাথে অভিভাবকদের দারিদ্র্য বিমোচনও একটা বড় বিষয়।
বাল্যবিয়ে কিন্তু একটি মারাত্মক সামাজিক সমস্যা। এ ব্যাপারে আমাদের আরো সজাগ থাকতে হবে। শহরকেন্দ্রিক বক্তৃতা বিবৃতিতে এর ক্ষতিকারক দিকগুলো সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রাম পর্যায়ে এবং শহরের বস্তিবাসীদের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করা গেলে আমরা হবো উপকৃত, দেশ হবে লাভবান। স্বার্থকতা আসবে সকল ক্ষেত্রে, ফলপ্রসূ হবে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের সকল আয়োজন। বিজ্ঞমহলের সাথে আমরাও একমত পোষণ করছি।
লেখক : শতদল বড়ুয়া
সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং প্রাবন্ধিক