বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা এখনো ৮৫–৯০ শতাংশের বেশি, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাস, তেল ও কয়লার ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ডলার সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাতে চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং শিল্পখাতে উৎপাদন কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে। একইসঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান এখনো মোট উৎপাদনের খুবই কম অংশ (প্রায় ৩–৫ শতাংশ), যা জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে “জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই ভবিষ্যৎ: সৌরশক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর অপরিহার্যতা” শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল বৈঠক আজ এনইউএস ট্রেনিং সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকটির আয়োজন করে ইয়াং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট রাইটস অ্যান্ড ক্লাইমেট (ওয়াইডব্লিউডিআরসি) এবং সহযোগিতা প্রদান করে গ্লোবাল ওয়ার্কফোর্স সার্ভিসেস (জিডব্লিউএস), এনইউএস, এফসিএইচডি, জিডব্লিউইএবি, টিজিডব্লিউএফ ও শিলিড।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ওয়াই ডব্লিউ ডি আর সি-এর এক্সিকিউটিভ চেয়ারপারসন নুসরাত সুলতানা আফরোজ। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরশক্তির সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকারকে এই খাতে বিনিয়োগ ও বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। অন্যথায় আমাদের দেশ গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে।।
বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ প্রকল্পের প্রাক্তন অ্যাডভাইজার এবং ফোরাম ফর কালচার অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (এফসিএইচডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ডঃ এস এম রাজ্জাক তার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় বর্তমান সমস্যা এবং সমাধানের উপায় সমূহ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং সৌরশক্তিকে একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
নারী উন্নয়ন শক্তির নির্বাহী পরিচালক ডঃ আফরোজা পারভীন তার বক্তব্যে বলেন, সৌরশক্তি শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, এটি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং গ্রামীণ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সৌর বিদ্যুৎ এর ব্যবহার আবাসিক ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুতের উপরে চাপ কমবে যা বাংলাদেশের দেশের কলকারখানা কে চালু রাখতে সহায়তা করবে। শিলিড-এর প্রচার সম্পাদক সেলিনা খাতুন তার বক্তব্যে বলেন, তরুণ প্রজন্মকে জলবায়ু ও জ্বালানি বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
কমিউনিটির পক্ষ থেকে উপস্থিত প্রতিনিধিরা বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে সহজ শর্তে ঋণ, কারিগরি সহায়তা এবং সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। বৈঠকে বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরশক্তিতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নীতিগত এবং জনসম্পৃক্ততা অত্যন্ত জরুরি।
সুপারিশসমূহ:
১. জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরশক্তি খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা।
২. ছাদভিত্তিক (রুফটপ) সোলার প্রোগ্রাম সম্প্রসারণ এবং নেট মিটারিং সহজ করা।
৩. গ্রামীণ ও অফ-গ্রিড এলাকায় সোলার হোম সিস্টেম ও সোলার পাম্পে ভর্তুকি প্রদান।
৪. বেসরকারি খাত ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কর সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা বৃদ্ধি।
৫. সৌরশক্তি প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি শিক্ষা জোরদার করা।
৬. নারী ও তরুণদের জন্য সৌর উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ।
৭. দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য শক্তির নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন তদারকি জোরদার করা।
৮. হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সৌর বিদ্যুৎ সংযোগে ভর্তুকি সহায়তা প্রদান করা।
অনুষ্ঠান শেষে অংশগ্রহণকারীরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে সৌরশক্তি খাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য।