পিরোজপুরে কাউখালী উপজেলার কচাঁ নদীর তীরে পরিত্যক্ত চরে কোটি টাকার তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে প্রায় ৮৬ একর চরের জমিতে এখন সবুজের সমারোহ।
একসময় নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে সবকিছু হারিয়েছিল কৃষক। কালের পরিবর্তনের সেই নদীর তীরে জেগে উঠেছে বিশাল চর। যা দীর্ঘ দিন পর্যন্ত ছিল পরিত্যক্ত। পরিত্যাক্ত এই জমিই আজ তরমুজ চাষের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে কোটি টাকার সম্ভাবনাময় কৃষিক্ষেত্র। সরকারি সহযোগিতা পেলে এই নদীর চরে কৃষিতে বিপ্লব ঘটার সম্ভাবনা দেখছে কৃষকরা। উপজেলার চিরাপাড়া পারসাতুরিয়া ইউনিয়নের কেশরতা গ্রামের মিজানুর রহমান প্রথম কৃষি অফিসের সাথে যোগাযোগ করে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরে তার বাড়ির নিকটস্থ কচাঁ নদীর তীরে কৃষি অফিসের উপজেলা কৃষি অফিসার সোমা রানী, কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার প্রদীপ কুমার হালদার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাইনুল ইসলামের পরামর্শে বিজয় নগর ৫০ শতক জমির উপরে এসএসিপি প্রকল্প সহযোগিতায় প্রদর্শনী তরমুজ চাষ শুরু করেন।
সেই প্রদর্শনী থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে কৃষক বৃহৎ পরিসরে তরমুজ চাষের উদ্যোগ নেন।
পরে স্থানীয় মিজানুর রহমান ও অন্যান্য জমির মালিকদের সাথে আলাপ আলোচনা করে পরিত্যক্ত ৮৬ একর চরের জমিকে চাষের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেই মোতাবেক ভোলা চরফ্যাশন থেকে তরমুজ চাষে পারদর্শী অভিজ্ঞ কৃষক মোহাম্মদ কামাল হোসেনকে নিয়ে আসেন নদীর চরে। ১৫ বছরের অভিজ্ঞ তরমুজ চাষি কামাল জমি দেখে তাদের সাথে পার্টনারশিপের ভিত্তিতে তরমুজ চাষে রাজি হয়ে যান। পরে স্থানীয় ৭-৮ জনের একটি দল গঠন করেন কামাল হোসেন। জমির মালিকদের বৈশাখ থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত সময়ের জন্য এক বিঘা জমি ১৫ হাজার টাকা চুক্তিতে গ্রহণ করে মোট ৮৬ একর জমিতে তরমুজ চাষ শুরু করেন। এই উদ্যোগী কৃষকের হাত ধরে প্রায় ১কোটি ১৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এ জমিতে শুরু হয়েছে বাণিজ্যিক তরমুজ চাষ, যা ইতোমধ্যে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
উন্নত পদ্ধতিতে তরমুজ চাষের ফলে উৎপাদন ভালো হওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতোপূর্বে তরমুজের এই ক্ষেত ৩ কোটি টাকায় ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে বলে কৃষক জানান। প্রকল্পে প্রায় ৩০ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন, যা স্থানীয় কর্মসংস্থানের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রতিটি দিনমজুরকে মাসিক প্রায় ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে অভিজ্ঞদের ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন দিতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি নদীর তীরবর্তী হওয়ায় ফসল রক্ষায় রয়েছে অতিরিক্ত ঝুঁকি। বন্যা বা নদী ভাঙনের আশঙ্কা সবসময়ই বিরাজমান। তদুপরি, সরকারি কোনো অনুদান বা আর্থিক সহায়তা না থাকায় পুরো প্রকল্পটি পরিচালনা করতে হচ্ছে ব্যক্তিগত উদ্যোগেই।
কাচাঁ নদীর তীরে তরমুজ চাষের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে পরিকল্পিত প্রচেষ্টা ও আধুনিক কৃষি পদ্ধতির মাধ্যমে পরিত্যক্ত জমিকেও উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। তবে টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার যথাযথ ব্যবস্থা।
তরমুজ চাষী ফজলুর রহমান ও মিজানুর রহমান জানান, ফসল রক্ষা বাঁধ তৈরি করা হলে
এই চরে আরও শতাধিক একর জমি চাষের আওতায় আনা সম্ভব। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ চাইলে এলাকায় কৃষি রক্ষা বাধঁ নির্মাণ করে এলাকায় কৃষিতে বিপ্লব সাধন করা সম্ভব বলে জানান।
কাউখালী উপজেলা কৃষি অফিসার সোমা রানী দাস জানান,আমরা কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে আসছি যাতে তারা অনাবাদি জমিগুলো চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসে। তরমুজ একটি লাভজনক ফসল। এখানকার মাটি ও জলবায়ু তরমুজ চাষের জন্য বেশ উপযোগী।
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন, কাউখালীতে কৃষকদের উদ্যোগ দেখে তিনি আনন্দিত। কোটি টাকা ব্যয়ে সাহসী ও উদ্যোগী কৃষকদের যাতে কোন ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে না হয় সেই জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট জানানো হবে।