জাতীয় বাজেট কেবল একটি দেশের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয় এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন-দর্শন, অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিচ্ছবি।
কোন খাতকে রাষ্ট্র কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে। অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো খাতগুলো নিয়ে বাজেট-পরবর্তী আলোচনা ও বিশ্লেষণ সবসময়ই ব্যাপক গুরুত্ব পায়। কিন্তু সংস্কৃতি খাত প্রায়ই সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে থেকে যায়। যেন এটি উন্নয়নের মূলধারার কোনো বিষয় নয়, বরং একটি গৌণ বা প্রান্তিক খাত।
বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাসচেতনা, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও মানবিক বিকাশের প্রধান ভিত্তি হলো তার সংস্কৃতি। সংস্কৃতি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি জাতির অস্তিত্বের অন্যতম স্তম্ভ। সাধারণত আমরা একটি দেশের অগ্রগতি পরিমাপ করি জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ কিংবা দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়নের সূচক দিয়ে। কিন্তু উন্নয়নের এই পরিমাপ কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না, যদি সেখানে মানুষের মনন, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের বিষয়টি অনুপস্থিত থাকে।
একটি সমাজকে ভেতর থেকে ঐক্যবদ্ধ রাখে তার সংস্কৃতি। ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, শিল্পকলা ও লোকঐতিহ্যের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে মানুষের চিন্তার জগৎ, সামাজিক বন্ধন এবং জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতিই মানুষকে মানবিক, সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিকে পরিণত করে। সেই কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো সংস্কৃতিকেও একটি মৌলিক উন্নয়ন খাত হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই উপলব্ধি এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। ফলে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও সংস্কৃতি বারবার উপেক্ষিত থেকে যায়। আর এই উপেক্ষা কেবল একটি খাতের প্রতি অবহেলা নয় এটি আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন-চিন্তার একটি বড় সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জন্য ৮২৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা হলেও সংস্কৃতি খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ০.০৯ শতাংশ।
যা ১ শতাংশের চেয়ে প্রায় ০.৯১ শতাংশ কম। গত অর্থবছরের তুলনায় বরাদ্দ কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। একটি দেশের সাংস্কৃতিক বিকাশ, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সৃজনশীল মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য এই বরাদ্দ কোনোভাবেই সন্তোষজনক বলা যায় না।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সংস্কৃতি এই জাতির সংগ্রাম ও আত্মপ্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান শক্তি। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গান, কবিতা, নাটক, সাহিত্য ও শিল্পকলা মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, ন্যায়বোধ এবং দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলেছে। বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় তাকে বারবার সংকট মোকাবিলার সাহস দিয়েছে। তাই সংস্কৃতির বিকাশ ও সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি জাতীয় দায়িত্ব।
বিশ্বায়নের এই যুগে সংস্কৃতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে বিশ্বের নানা দেশের সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনধারা সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এতে যেমন নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার দ্বার উন্মুক্ত হচ্ছে, তেমনি নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে হলে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় আমরা ধীরে ধীরে আমাদের স্বকীয়তা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ব।
বর্তমান বাস্তবতায় দেশের বহু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সীমিত সম্পদ নিয়ে টিকে আছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, গ্রন্থাগার, নাট্যসংগঠন, সংগীত,আবৃত্তি,নৃত্য এবং লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণে নিয়োজিত সংগঠনগুলো নানা সংকটে জর্জরিত। অনেক মেধাবী শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে হিমশিম খান। ফলে সাংস্কৃতিক চর্চার পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি মানে শুধু কিছু অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য অর্থ ব্যয় নয়। এর অর্থ হলো সাংস্কৃতিক অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, গ্রন্থাগারের আধুনিকায়ন, শিল্পীদের কল্যাণ নিশ্চিত করা, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং নতুন প্রজন্মের জন্য সৃজনশীল বিকাশের পরিবেশ তৈরি করা। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক পর্যটনের বিকাশের মাধ্যমেও অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখা সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে সংস্কৃতিকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সংস্কৃতির ভূমিকা। বর্তমান সময়ে সামাজিক বিভাজন, অসহিষ্ণুতা, সহিংসতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় সংস্কৃতিই পারে মানুষকে সহনশীলতা, সৌহার্দ্য, মানবিকতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা দিতে। একটি প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ সমাজকে আরও উদার, গণতান্ত্রিক ও সহাবস্থানমুখী করে তোলে। তাই সংস্কৃতিতে বিনিয়োগকে কোনোভাবেই অনুৎপাদনশীল ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল সমাজ গঠনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
তবে আশার বিষয় হলো,সংসদে উত্থাপিত বাজেট এখনো চূড়ান্ত হয়নি; চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে আলোচনার মাধ্যমে এতে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও পুনর্বিবেচনার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সেই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে প্রত্যাশা সংস্কৃতি খাতের কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করে এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়ে কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। কারণ সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাসবোধ, মূল্যবোধ এবং সৃজনশীলতার ভিত্তি নির্মাণের অন্যতম প্রধান শক্তি।
একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি শুধু অর্থনৈতিক সূচক, অবকাঠামোগত উন্নয়ন মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সেই সমাজের মানুষের চিন্তার গভীরতা, মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা এবং সৃজনশীল বিকাশের ওপর ভিত্তি করে। সংস্কৃতি সেই ভিত্তিকে দৃঢ় করে, মানুষের ভেতরের মানবিক সত্তাকে জাগ্রত করে এবং সমাজকে ভেতর থেকে সুসংগঠিত করে তোলে। তাই উন্নয়নের সামগ্রিক ধারণায় সংস্কৃতিকে প্রান্তিক নয়, বরং কেন্দ্রীয় অবস্থানে রাখা সময়ের অপরিহার্য দাবি।
এই প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টি কেবল একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। কারণ একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ভিত্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে না, বরং তাদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকেও সমৃদ্ধ করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি সুস্থ, প্রগতিশীল এবং মানবিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রত্যাশা করি চূড়ান্ত বাজেট পাসের আগে সংস্কৃতি খাতের প্রতি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি আরও উদার ও অগ্রসর হবে।