বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামি জগতে আজ শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, রবিবার সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার প্রধান শাইখুল হাদিস ও প্রধান মুফতি, যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা হাফেজ আহমদুল্লাহ (রহ.)। তাঁর চলে যাওয়া যেন ইসলামী জ্ঞানচর্চার আকাশ থেকে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন।
জন্ম ও শৈশব
আল্লামা হাফেজ আহমদুল্লাহ (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন ১৪ রবিউস সানি, ১৩৬১ হিজরি (১২ মে, ১৯৪১) চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার নাইখাইন গ্রামে। সম্ভ্রান্ত ও আলেম পরিবারে জন্ম হওয়া তিনি শৈশবেই কোরআন হেফজ সম্পন্ন করেন মাত্র সাত বছর বয়সে। তাঁর পিতা হযরত মাওলানা ঈসা সাহেব (রহ.) ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলেম।
শিক্ষাজীবন ও জ্ঞানপিপাসা
প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ভর্তি হন জিরি ইসলামিয়া আরবিয়া মাদ্রাসায়। মাত্র দশ বছর বয়সে কোরআন হেফজ সম্পন্ন করার পর দরসে নেজামির প্রাথমিক থেকে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন এবং সর্বদা প্রথম স্থান অধিকার করেন। উচ্চশিক্ষার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় ১৩৮৩ হিজরিতে পাকিস্তানে পাড়ি জমান। লাহোরের জামিয়া আশরাফিয়ায় দাওরায়ে হাদিস অধ্যয়ন করে উত্তীর্ণ হন এবং পরবর্তীতে মুলতানের খাইরুল মাদারিসে ফুনুনাতে আলিয়া সমাপ্ত করেন। করাচিতে ফতোয়া বিভাগে ভর্তি হয়ে মুফতিয়ে আজম আল্লামা মুফতি আহমদ শফী (রহ.)-এর নিকট ইফতা শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাদান ও দাওয়াতি জীবন
দেশে ফিরে ১৩৮৮ হিজরিতে তিনি দীর্ঘ ২৩ বছর জিরি ইসলামিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ায় শাইখুল হাদিস ও প্রধান মুফতি হিসেবে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় হাদিসের খেদমতে অতিবাহিত করেন। তাঁর দরসগুলো শুধুই পাঠদান নয়, বরং ছাত্রদের আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার উৎসব। সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিমসহ কুতুবুস সিত্তার আলোচনায় ছাত্ররা মুগ্ধ হতো। এছাড়া তিনি আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ-এর সহ-সভাপতি এবং ইসলামিক ফিকহ্ বোর্ড বাংলাদেশ-এর সদস্য ছিলেন।
আধ্যাত্মিক সংযোগ
আধ্যাত্মিক জীবনে তিনি করাচিতে মুফতিয়ে আজম মুফতি শফী (রহ.)-এর নিকট বাইআত গ্রহণ করেন। পরে বাংলার হাফেজ্জি হুজুর (রহ.)-এর মাধ্যমে বাইআত ও খিলাফত প্রাপ্ত হন। এর মাধ্যমে তিনি আত্মশুদ্ধি ও ইলমে বাতেনের দাওয়াত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেন।
রচনাকর্ম
ব্যস্ত অধ্যাপনাজীবন সত্ত্বেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন, যেমন—দাফ‘উল ইলতিবাস, মাশায়েখে চাটগাম, তাজকেরাতুন নূর, তাসকিনুল খাওয়াতির ফি শরহিল আশবাহি ওন্নাওয়াযির, এবং ইসলামের দৃষ্টিতে শেয়ার বাজার ও মাল্টিলেভেল মার্কেটিং। এছাড়া তাঁর তত্ত্বাবধানে জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া থেকে মাজমুয়ে ফাতোয়া প্রকাশিত হয়েছে।
চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব
যুগশ্রেষ্ঠ আলেম হলেও তিনি ছিলেন বিনয়ী, ধৈর্যশীল ও সহজ-সরল। খ্যাতি বা বাহ্যিক জৌলুস তাঁর জীবন স্পর্শ করতে পারেনি। ছাত্রদের কাছে শিক্ষক নয়, অভিভাবক; সাধারণ মানুষের কাছে আশ্রয়স্থল; আলেম সমাজের কাছে পথপ্রদর্শক ছিলেন তিনি। তাঁর আচরণে প্রতিফলিত হতো আল্লাহভীতি ও রাসূলপ্রেম।
জাতির অপূরণীয় ক্ষতি
আল্লামা হাফেজ আহমদুল্লাহ (রহ.)-এর ইন্তেকালে ইসলামী শিক্ষাঙ্গন এক মহীরুহ হারালো। এমন আলেম শতাব্দীতে একবার জন্মায়। তাঁর শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব নয়। আজ আমরা তাঁর অনুপস্থিতি উপলব্ধি করছি, এবং আগামী প্রজন্ম আরও বেশি গভীরভাবে অনুভব করবে এই শূন্যতা।
শেষ বিদায়
রবিবার ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ রাত ৯টায় জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া মাদ্রাসার মাঠে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। লাখো মানুষ অশ্রুভেজা চোখে প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানায়। তিনি মাটির নিচে শায়িত হলেও তাঁর শিক্ষা, ত্যাগ ও প্রেরণা চিরকাল অম্লান থাকবে।
আল্লামা হাফেজ আহমদুল্লাহ (রহ.) শিখিয়েছেন—জ্ঞানই আলোকবর্তিকা। আলেমের দায়িত্ব শুধুই পাঠদান নয়, জাতিকে সঠিক পথে পরিচালনা করা। তাঁর জীবন আমাদের জন্য শিক্ষা, তাঁর মৃত্যু আমাদের জন্য প্রেরণা। মহান আল্লাহ তাঁর সমস্ত খেদমত কবুল করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকামে স্থাপন করুন। আমীন।
লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি