‘তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি
অভিযোগ প্রমাণ হলে ঠিকাদারের লাইসেন্স বাতিল’
জেলার ফুলবাড়িয়ায় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিদ্যালয় ভবন নির্মাণে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারসহ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কাজটি করছে হৃদয় এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক জয়নাল আবদীন বাদল। ইতিমধ্যে এ অনিয়মের তদন্তে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। চলতি মাসেই এই কমিটি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে প্রধান প্রকৌশলী(এলজিইডি) বরাবরে রিপোর্ট দেয়ার কথা রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল হতে পারে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান।
বিগত ২০২২-২৩ অর্থবছরের পিইডিপি চার প্রকল্পের আওতায় এলজিইডি দ্বিতল বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের জন্য ৯৯ লাখ ২৯ হাজার ১ শত ৪৬ টাকা ব্যয় ধরে দরপত্র আহবান করে। ভবন নির্মাণের কাজটি পায় হৃদয় এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যার স্বত্বাধিকারী জয়নাল আবদীন বাদল। কাজটি পাওয়ার পর স্থানীয় ঠিকাদার আহসান হাবিব নামের এক ব্যক্তির নিকট নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিক্রি করে দেয় হৃদয় এন্টারপ্রাইজ। দরপত্রের শিডিউল না মেনে যেনতেনভাবে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে সেই ভবনের পিলারের কংক্রিটের ঢালাই হাতের ঘসাটেই খসে পড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ‘ভবনটির নিকটে আসা নিষেধ’ সাবধানবাণী লেখা একটি সাইনবোর্ড নির্মাণাধীন ভবনের পিলারে টানিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় ভবন নির্মাণের প্রায় কোটি টাকা জলে গেল বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের ওই বিদ্যালয়ের দ্বিতল ভবন নির্মাণের জন্য চুক্তি অনুযায়ী গত বছরের ২৭ জানুয়ারি ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হৃদয় এন্টারপ্রাইজ। যা চলতি বছরের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্র অনুযায়ী কাজ না করায় কাজ চলমান অবস্থাতেই ভবনের পিলারে আচড় অথবা ঘসা দিলেই পিলারের কংক্রিটের ঢালাই খসে পড়ছে। এ অবস্থায় যেকোনো সময় ভবনটি ধসে পড়তে পারে বলে আশংকা করছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, ওই ভবন নির্মাণে নি¤œমানের ইট, পাথর, বালু, সিমেন্ট দিয়ে কাজ করা ভবনটির অবস্থা খুবই নাজুক। যেকোনো সময় ধ্বসে পড়তে পারে ভবনটি। তাই দ্রুত ভবনটি ভেঙে পুনরায় নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়রা।
জানা যায়, উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী প্রণব সরকার এবং উপ সহকারী শাহরিয়ার কাজটি তদারক করার দায়িত্বে ছিলেন। পিলার ঢাইয়ের সময় নামমাত্র সিমেন্ট ব্যবহার করায় স্থানীয় লোকজনের তোপের মুখে পড়ে সহকারী ইঞ্জিনিয়ার প্রণব সরকার সেখান থেকে কোন রকমে পালিয়ে রক্ষা পান। ব্যবহার অযোগ্য ৩০ ব্যাগ সিমেন্ট দিয়ে কাজ করেছেন বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন। ঠিকাদার ইতিমধ্যে ২৫ লাখ টাকা উত্তোলন করে নিয়েছেন। আরো ৩০ লাখ টাকা উঠানোর জন্য প্রক্রিয়ায় ছিল, তবে অভিযোগ উঠায় সেই অর্থ আর উত্তোলন করতে পারেনি।
এ অবস্থায় বিদ্যালয়ের দপ্তরি আ. জলিল মিয়া একটি কংক্রিটের পিলারে হাত দিয়ে খুচা দিতেই জুরজুর করে খসে পড়তে শুরু করে। পরবর্তীতে শিক্ষকদের বিষয়টি অবগত করলে সে সময়েই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে ভবন নির্মাণে মারাত্মক অনিয়মের বিষয়টি অবগত করেন।
পরবর্তীতে উপজেলা প্রকৌশলী ও ইউএনওকে জানানো হলে উভয়েই নির্মাণাধীন বিদ্যালয় ভবন পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন ইউএনও। পরবর্তীতে গত ২১ জুন এলজিইডির ময়মনসিংহ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুজ্জামান ও ২৩ জুন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম ইসমত কিবরিয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। উপজেলা প্রকৌশলী জানান, দায়িত্ব অবহেলার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া এ বিষয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রেজাউল করিম অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ঢাকা বিভাগকে প্রধান করে ৩ তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অন্য দুজন সদস্য হলেন আব্দুর রাজ্জাক নির্বাহী প্রকৌশলী ঢাকা ও মোহাম্মদ নিয়ামুল হক, পি ই ডিপি ৪ ঢাকা।
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, পিপিআর অনুযায়ি বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল হতে পারে। অথবা দুই বছরের জন্যে এলজিইডি’র কোন দরপত্রে অংশ গ্রহণ করতে পারবে না।
ময়মনসিংহের এলজিইডি’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম ইসমত কিবরিয়া জানান, কার্যাদেশ প্রাপ্ত কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে তা বিক্রি করে দেয়ার নিয়ম নেই। চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানকেই এ বিষয়ে দায়দায়িত্ব নিতে হবে। চুক্তি অনুযায়ি হৃদয় এন্টারপ্রাইজ কাজটি নিজেরা না করে নামসর্বস্ব ঠিকাদার রাজমিস্ত্রী আহসান হাবিবের কাছে বিক্রি করে চুক্তি ভঙ্গ করেছে যা পিপিআর অনুযায়ি দন্ডণীয় অপরাধ।
এদিকে ভবন নির্মাণের ফলে গত ৭ মাস ধরে অস্থায়ী ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ একটি টিনের ছাপড়া ঘরে ক্লাস করছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা চরম বিপাকে পড়েছেন।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোছা. রাবেয়া খাতুন বলেন, ভবনটি এতোই নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি করা হয়েছে যে ভবনটি পাশ দিয়ে কেউ হেটে যেতেও ভয় পায়। তাই এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণাধীন ভবনটি ভেঙে পূননির্মাণের দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাহিদুল করিম বলেন, ময়মনসিংহ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল ভবনটি পরিদর্শন করেছেন। ঢাকা থেকেও একটি প্রকৌশলী টিম সরেজমিনে তদন্ত করবেন। এরপর তারা যে প্রতিবেদন দিবেন সেই অনুযায়ী ভবনটির কাজ সম্পন্ন করা হবে।