রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলা মৌজায় অবস্থিত ‘ফিউচার টাউন’ নামে রাজউকের কালো তালিকাভুক্ত একটি নিবন্ধনবিহীন হাউজিং প্রকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের শতকোটি টাকা বিনিয়োগের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ আয়ের অর্থ বিনিয়োগ করে সেখানে বহুতল বাণিজ্যিক-আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজউকের অনুমোদন না থাকায় এই এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণে বিধিনিষেধ রয়েছে। তবুও প্রভাব খাটিয়ে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ‘উদয়ন কল্যাণ সমিতি’ নামের একটি নিবন্ধনবিহীন সংগঠনের মাধ্যমে প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। সমিতিটির সভাপতি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দ্বীপক কুমার এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক আনোয়ার হোসেন মুন্না।
প্রকল্প এলাকায় ৪৮ শতাংশ জমির ওপর প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট আয়তনের ১১ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটিতে চারটি লিফট, নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও গাড়ি পার্কিং সুবিধা রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় থেকে দশম তলা পর্যন্ত প্রতি তলায় আটটি করে মোট ৭২টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া ১১ তলায় একটি কমিউনিটি সেন্টার ও ছয়টি ছোট আকারের ফ্ল্যাটসহ মোট ৭৮টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১১০ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বহুতল ভবন নির্মাণে একাধিক সরকারি সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে রয়েছে রাজউকের জমির শ্রেণি নির্ধারণ ও নকশা অনুমোদন, ফায়ার সার্ভিসের অগ্নি নিরাপত্তা ছাড়পত্র, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, সিভিল এভিয়েশনের উচ্চতা অনুমোদন, সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা ও বিদ্যুৎ সংযোগের অনুমোদন।
তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব অনুমোদনের অনেকগুলোই নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে রাজউকের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা যথাযথভাবে যাচাই করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, “এলাকায় অনেকেই এভাবে নির্মাণ করেছেন, তাই আমরাও করেছি। আইন জেনেই কাজ করছি।”
অন্যদিকে, রাজউকে আবেদন করেও অনুমোদন না পাওয়ার কথা স্বীকার করে সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৩ সালে আবেদন করা হলেও অনুমোদন না পাওয়ায় নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, প্রকল্পটির সঙ্গে একজন জেলা জজের সম্পৃক্ততার দাবি করা হলেও তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। ঢাকা জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ইকবাল হোসেন জানান, “রাকিবুল হাসান নামে ঢাকায় কোনো জেলা জজ নেই। কারও নাম ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।”
রাজউকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকার ভেতরে একাধিক অবৈধ হাউজিং প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত থাকায় আইন প্রয়োগে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন,অনেকেই আইনের তোয়াক্কা না করে ভবন নির্মাণ করছেন। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি।
এদিকে, তথ্য সংগ্রহের সময় প্রতিবেদককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এক পর্যায়ে তথ্য দেওয়ার কথা বলে রাজধানীর একটি রেস্টুরেন্টে ডেকে নিয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশে বিরত থাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধ আয়ের অর্থ বিনিয়োগ ও অনুমোদনবিহীন নির্মাণের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘনের ঘটনা সুশাসনের জন্য বড় হুমকি। এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।