লোকান্তরিত হইলেন গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আমৃত্যু সংগ্রামী ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বুধবার এক প্রতিবেদনে যেমনটা বলা হইয়াছে, মঙ্গলবার রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে তাঁহার মৃত্যুর খবর সাংবাদিকদের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের প্রধান কিডনি বিশেষজ্ঞ ও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর প্রধান চিকিৎসক অধ্যাপক মামুন মোস্তাফী। দীর্ঘদিন কিডনি রোগসহ বিবিধ স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভুগিতেছিলেন তিনি। জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্ম ২৭ ডিসেম্বর ১৯৪১ সালে, চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায়। তাঁহার বয়স হইয়াছিল প্রায় ৮২ বৎসর। এই মহান দেশপ্রেমিকের প্রয়াণে আমরা ঢাকা প্রতিদিন পরিবারেরর পক্ষ হইতে গভীর শোক প্রকাশ করিতেছি এবং তাঁহার শোকসন্তপ্ত সহধর্মিণী, দুই পুত্রকন্যা এবং অন্যান্য স্বজনের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।
আমাদের মধ্য হইতে শারীরিকভাবে বিদায় লইলেও, যতদিন এই দেশ থাকিবে ততদিন দেশবাসীর অন্তরে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাঁচিয়া থাকিবেন–ইহা অবলীলায় বলা যায়। ৮২ বৎসরের জীবনে এই জাতির জন্য যত কিছু করিয়াছেন, তাহার জন্যই প্রজন্মের পর প্রজন্মে স্মরিত হইবেন তিনি। শুধু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁহার যে অবদান, উহাই যথেষ্ট যে কাহারও জন্য জাতির মানসপটে চিরস্থায়ী আসন পাইবার। বাবা ছিলেন অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী এবং ১৯৩০ সালে চারি দিবসের জন্য দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ব্রিটিশের কবল হইতে চট্টগ্রামকে স্বাধীন করিবার যুববিদ্রোহের নায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনের ছাত্র। সেই ঐতিহ্যের ধারক হিসাবে কিনা জাফরুল্লাহ চৌধুরী পরিবারের বড় সন্তান হইয়াও সকল প্রকার পশ্চাৎ-মুখিনতা ভুলিয়া, ১৯৭১ সালে ইংল্যান্ডের অভিজাত রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস হইতে এফআরসিএস ডিগ্রি অর্জন করিয়া চিকিৎসকরূপে প্রতিষ্ঠালাভের সম্ভাবনা পায়ে দলিয়া মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়েন। পাকিস্তানি পাসপোর্ট ছুড়িয়া ফেলিয়া প্রথমে আগরতলার মেলাঘর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং পরে সতীর্থদের সঙ্গে লইয়া ঐখানেই ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। উহারই ধারাবাহিকতায় যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে গণস্বাস্থ্য হাসপাতাল নামে প্রতিষ্ঠান গড়িয়া গণমুখী স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনেরই অংশ হিসাবে তিনি গত শতকের ৮০-এর দশকে সরকারকে দিয়া জাতীয় ঔষধনীতি প্রণয়ন ও কার্যকর করান। যাহার সুফল অন্তত জরুরি প্রায় সকল ঔষধ দেশেই উৎপাদন এবং সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখিবার কারণে দেশবাসী অদ্যাবধি ভোগ করিতেছে।
সমাজভিত্তিক জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির রূপরেখাও হাজির করিয়াছেন তিনি, যাহা বাস্তবায়নের সংগ্রাম অব্যাহত রহিয়াছে। ডা. জাফরুল্লাহর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্যারামেডিকের ধারণা আজিকে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। কভিড-১৯ অতিমারির সময় কো-মরবিডিটির একাধিক কারণে নিজে ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তিনি যেরূপে করোনাভাইরাস পরীক্ষা, প্রতিরোধ ও প্রতিকারে গবেষণাকর্মে যুক্ত হন, উহা সত্যই বিরল। কিডনি সচল রাখিবার প্রয়োজনে বহু বৎসর ধরিয়া তাঁহাকে সপ্তাহে অন্তত দুই-তিনবার ডায়ালাইসিস সেবা গ্রহণ করিতে হইত। বিদেশের নামি-দামি কোনো হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপন করিয়া হয়তো আরও সবলভাবে অনেক বৎসর বাঁচিবার সুযোগ ছিল তাঁহার। কিন্তু তিনি নীতিগত কারণেই সেই সুযোগ গ্রহণ করেন নাই। এই নীতির উপর দাঁড়াইয়াই তিনি তাঁহার গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে ডায়ালাইসিস কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন, যাহা ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ডায়ালাইসিস কেন্দ্রের স্বীকৃতি লাভ করিয়াছে। কতটা নীতিনিষ্ঠ হইলে একজন মানুষ জীবনসায়াহ্ন জানিয়াও স্বাস্থ্যসেবার জন্য অন্য অনেক উন্নত প্রযুক্তির হাসপাতালের বদলে নিজেরই হাসপাতালে থাকিয়া যায়– ডা. জাফরুল্লাহ গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া উহা দেখাইয়া গিয়াছেন।
যে কোনো জাতীয় দুর্যোগে তিনি ভুক্তভোগীদের পাশে নিজের অসুস্থ শরীর লইয়াই যেভাবে ছুটিয়া গিয়াছেন এবং যে কোনো রাজনৈতিক সংকটে নির্ভীক দিশারির ভূমিকা পালন করিয়াছেন, তাহারও তুলনা অন্তত এই দেশে খুব একটা নাই। সরল, নির্লোভ ও সাহসী জীবনযাপনের যে দৃষ্টান্ত জাফরুল্লাহ চৌধুরী রাখিয়া গেলেন, তাহা শুধু তাঁহার ন্যায় একজন ক্ষণজন্মা মানুষের পক্ষেই সম্ভব। তাঁহার এই দৃষ্টান্ত উত্তর প্রজন্মেও অনুসৃত হউক– ইহাই আমাদের কামনা।