ভূমিকম্প একটি অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও এ থেকে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির বড় অংশই মানুষের তৈরি—এমন মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, ভবন নির্মাণে নীতিমালা না মানা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্নীতি ও জনসচেতনতার অভাব ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ ভূমিকম্প মোকাবিলায় পুরোপুরি অপ্রস্তুত।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত “ভূমিকম্পে জীবন ও সম্পদ রক্ষায় করণীয়” শীর্ষক এক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। এডাব (এসোসিয়েশন অব ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিজ ইন বাংলাদেশ) এবং বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)-এর যৌথ উদ্যোগে এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
এডাব-এর চেয়ারপারসন আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে এবং পরিচালক এ কে এম জসীম উদ্দিনের সঞ্চালনায় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাপস-এর সভাপতি অধ্যাপক ড. আহমাদ কামরুজ্জামান মজুমদার। ভূমিকম্পের কারিগরি দিক নিয়ে মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনা করেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স বাংলাদেশের সাবেক পরিচালক (অপারেশন) মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভূতাত্ত্বিকভাবে ভূমিকম্পঝুঁকিপূর্ণ। ভূমিকম্প নিয়মিত হলেও কখন এবং কোথায় হবে তা আগে থেকে জানা যায় না। তবে ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতির দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহরে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হলে ১০ লাখের বেশি ভবন ধসে পড়তে পারে এবং জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আলোচনায় আরও বলা হয়, বহুতল ভবনে বিকল্প বের হওয়ার পথ না থাকা, নরম পলিমাটিতে ভবন ও সড়ক নির্মাণ, অতিরিক্ত ঘনবসতি, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা ভূমিকম্পের সময় পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলতে পারে। ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজ চালানো, আহতদের হাসপাতালে নেওয়া কিংবা অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম পরিচালনার মতো জরুরি ব্যবস্থাপনাও পর্যাপ্ত নয়।
‘আমরা নিজেদের খোঁড়া কবরের মধ্যেই বসবাস করছি’—এমন মন্তব্য করে বক্তারা বলেন, ভূমিকম্পের আগে, সময় এবং পরবর্তী করণীয় বিষয়ে ব্যক্তি, পরিবার, কমিউনিটি ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত জরুরি পরিকল্পনা প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সংস্কার, সিভিল ডিফেন্স ও ফায়ার সার্ভিসকে শক্তিশালী করা, কমিউনিটি ভলান্টিয়ার গড়ে তোলা, স্থানীয় সরকারকে কার্যকর ভূমিকা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।
এ ছাড়া স্কুল-কলেজ ও পাড়া-মহল্লাভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি, হাসপাতালগুলোতে ট্রমা মোকাবিলায় মানসিক সহায়তা কার্যক্রম এবং জিওলজিক্যাল সার্ভে বিভাগকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও সম্পদ দেওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।
সভায় বক্তারা বলেন, ভূমিকম্প প্রাকৃতিক হলেও ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সুশাসনের ওপর নির্ভরশীল। জনগণই রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস—এই উপলব্ধি থেকে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রকে দায়িত্ব পালনে বাধ্য করার আহ্বান জানান তাঁরা।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান, অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নাঈম ওয়ারা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান।