রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে মিয়ানমারের দিক হইতে পুনরায় যেই সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাইতেছে, উহাতে সটান আশাবাদী হইবার কারণ নাই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করিয়া বুধবার সমকালের এক প্রতিবেদনে যদিও বলা হইয়াছে, বর্ষা মৌসুম আরম্ভের পূর্বেই দেশটি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করিতে চাহে; অভিজ্ঞতা স্মরণে উহাতে আস্থা স্থাপন করা কঠিন। ফলত বাংলাদেশ যৌক্তিকভাবেই প্রস্তাব দিয়াছে, রাখাইনে প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ সম্পর্কে সরেজমিন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রথমে রোহিঙ্গাদের নিজেদের সন্তুষ্ট হইতে হইবে। দীর্ঘদিন অপেক্ষায় রাখিয়া সম্প্রতি মিয়ানমার উক্ত প্রস্তাবে সম্মতি দিয়াছে। ইহারই ধারাবাহিকতায় মধ্যস্থতাকারীরূপে ঢাকাস্থ চীনা রাষ্ট্রদূত কক্সবাজার শিবির হইতে ২০ সদস্যের একটি রোহিঙ্গা প্রতিনিধি দলের স্বল্প সময়ের মধ্যে রাখাইন সফর লইয়া আলোচনা করিতে মঙ্গলবার ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিবের সহিত বৈঠক করেন।
স্মর্তব্য, এই দফার পূর্বে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দফা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ গৃহীত হইয়াছিল। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে দুই দফাতেই রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহ এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতার অভাবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার শুভ সূচনা সম্ভব হয় নাই। এই কারণেই বাংলাদেশ রাখাইন পরিস্থিতি সম্পর্কে রোহিঙ্গাদের সন্তুষ্টির বিষয়টি নিশ্চিত করিবার লক্ষ্যে তাহাদের প্রতিনিধিদের রাখাইন সফরের আয়োজনের উপর গুরুত্ব দিয়া আসিতেছে। এই দফায় সতর্কতার সহিত প্রত্যাশা করা যাইতে পারে, প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার সরকার আন্তরিক হইলে রোহিঙ্গা প্রতিনিধি দলের প্রস্তাবিত সফরটি অনুষ্ঠিত হইবে। রাখাইন হইতে ফিরিয়া আসা রোহিঙ্গা প্রতিনিধি দলটি তথাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করিলেই কেবল ইতোমধ্যে মিয়ানমার সরকারের যাচাই-বাছাইকৃত এক সহস্র চারি শত রোহিঙ্গার বহুল প্রতীক্ষিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরম্ভ হইবে। অবশ্য স্মরণে রাখিতেই হইবে, বাংলাদেশেঅবস্থানরত ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার তুলনায় দেড় সহস্রেরও কম জনের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সিন্ধুর মধ্যে বিন্দু মাত্র। কথিত যাচাই-বাছাই এবং প্রত্যাবাসনের এই গতি অব্যাহত থাকিলে কয়েক দশক লাগিয়া যাইতে পারে।
চলতি উদ্যোগে এই প্রশ্নও অবশ্য মিটিয়া যাইবে না– মিয়ানমার প্রকৃতই উহার নাগরিকদের ফিরাইয়া লইতে আদৌ আগ্রহী কিনা। মিয়ানমার সরকার ও সামরিক বাহিনীর ধারাবাহিক নির্যাতনের কারণে বিশেষত ২০১৭ সালে সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা স্বীয় ভিটা-মাটি ত্যাগ করিয়া বাংলাদেশে পালাইয়া আসে। উহাদের প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশ ২০১৮ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে; যথায় মিয়ানমার দুই বছরের মধ্যে সকল রোহিঙ্গাকে মাতৃভূমিতে ফিরাইয়া লওয়ার অঙ্গীকার করে। দুঃখজনক হইল, প্রধানত মিয়ানমার সরকারের অসহযোগিতার কারণে অদ্যাবধি একজন রোহিঙ্গাও স্বীয় ভিটায় প্রত্যাবর্তন করিতে পারে নাই। স্মর্তব্য, ২০১৭ সালের পূর্বেও কয়েক দফায় একই বর্বর নির্যাতনের শিকার হইয়া কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। উহাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে সম্পাদিত চুক্তিও মিয়ানমার কার্যকর করিতে ব্যর্থ হইয়াছে। সম্ভবত এহেন তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণে রাখিয়াই মঙ্গলবারের বৈঠক সম্পর্কে সংবাদকর্মীদের বিশেষ কিছু জানানো হয় নাই। যদি রুদ্ধদ্বার কূটনীতিতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনের বিষয়টি মুক্তপ্রাণ লাভ করে, উহাতে আমাদের আপত্তি নাই।
প্রশ্ন আরও রহিয়াছে। প্রতিবেদনেই বলা হইয়াছে, জাতিসংঘের আইসিজে-আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে জাম্বিয়ার দায়েরকৃত রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় আগামী ২৪ মে মিয়ানমারকে পাল্টা জবাব উপস্থাপন করিতে হইবে। নিয়ম অনুসারে, নেপিদোর পক্ষ হইতে নূতন কোনো আবেদন না করা হইলে পরবর্তী তারিখ হইতে মামলাটির শুনানি শুরু হইবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের নূতন উদ্যোগের সহিত উক্ত মামলার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা, অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ জরুরি। ইহা সত্য, রোহিঙ্গা সমস্যার আশু সমাধান অতীব জরুরি। বৎসরের পর বৎসর লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে গিয়া বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক, পরিবেশ-প্রতিবেশ, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি প্রকট হইয়া উঠিতেছে। তাই বলিয়া দ্রুততার সহিত কার্য সমাধা করিতে গিয়া অতীতে অনেকবার ছলচাতুরীর আশ্রয় লওয়া মিয়ানমারের ফাঁদে পুনর্বার পদ প্রবিষ্টকরণের কোনো কারণ নাই।