বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবন ও অবকাঠামো দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পানি সম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপকূলীয় এলাকার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ নকশা ও আধুনিক প্রকৌশল প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
রোববার বিকেলে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) সদর দপ্তরের কাউন্সিল হলে আয়োজিত ‘Corrosion-Resistant Coastal Infrastructure in Bangladesh’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আইইবির পুরকৌশল বিভাগ এ সেমিনারের আয়োজন করে।
পানি সম্পদমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার অধিকাংশ স্কুল ভবন, সরকারি স্থাপনা ও জনসেবামূলক অবকাঠামোতে লবণাক্ততার প্রভাবে ক্ষয় সৃষ্টি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই এখনই টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হলো পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ। এ প্রকল্পের সঙ্গে দেশের ২৪টি জেলার মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত নিরাপত্তা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির স্বল্পতা এবং বর্ষায় অতিরিক্ত প্লাবন ও জলাবদ্ধতার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ বাড়ছে, যা অবকাঠামো ক্ষয়ের অন্যতম কারণ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইইবির প্রেসিডেন্ট ও রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু) বলেন, উপকূলীয় এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে মাটির গুণাগুণ, পানির বৈশিষ্ট্য, লবণাক্ততার মাত্রা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে নকশা প্রণয়ন করতে হবে। তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য পৃথক প্রকৌশল নকশা মানদণ্ড ও বিশেষ শর্তাবলি প্রণয়ন সময়ের দাবি।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ও প্রতিকূল পরিবেশগত প্রভাবে ভবন, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোতে দ্রুত corrosion বা ক্ষয় সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় কমানোর জন্য নিম্নমানের রড ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়। আবার অনুমোদিত নকশা ও স্পেসিফিকেশনও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ছে।
আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান বলেন, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শূন্য পদে দ্রুত যোগ্য প্রকৌশলী নিয়োগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ৬ মার্চ পুরকৌশল বিভাগের ৫০ জনবল নিয়োগের বিষয় নির্ধারিত হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসলামী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (আইইউটি) সিভিল ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. তারেক উদ্দিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অবকাঠামোগত ক্ষয়ের কারণে প্রতিবছর প্রায় ১৪ থেকে ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, বন্দর, শিল্পকারখানা ও উপকূলীয় স্থাপনাগুলোতে corrosion বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ অবকাঠামোর নকশা তৈরির সময় নির্ধারিত আয়ুষ্কাল বা durability period স্পষ্টভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে ২৫ থেকে ৩০ বছর পর অনেক স্থাপনা দ্রুত ক্ষয়ের মুখে পড়ে। এ কারণে নকশা প্রণয়নের সময় থেকেই স্থায়িত্বকাল, উপকরণ নির্বাচন ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইইবির পুরকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম (খোকা)। সঞ্চালনা করেন বিভাগের সম্পাদক প্রকৌশলী নেসার উদ্দিন।