দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নীতিগত সংস্কার, জবাবদিহি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, গ্যাসের মজুদ কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা—এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ এখন বাংলাদেশের সামনে।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা শীর্ষক সুপারিশমালা প্রণয়ন’ বিষয়ক এক কর্মশালায় এসব কথা উঠে আসে। সোমবার (৪ মে) বিকেলে ঢাকার রমনায় আইইবি সদর দপ্তরের কাউন্সিল হলে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন আইইবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী খান মনজুর মোরশেদ। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নর্থ পাওয়ার স্টেশন স্থাপনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জ্বালানি সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান বলেন, বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই গ্যাসনির্ভর (প্রায় ৫০-৫৫ শতাংশ)। কিন্তু দেশীয় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি জানান, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও গড় চাহিদা ১৪-১৬ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় এতে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
মূল প্রবন্ধে প্রফেসর ড. এম শহিদুল ইসলাম বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ৩০ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ চাহিদা পূরণে জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির সীমিত উৎপাদন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বাধা তৈরি করছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। সিস্টেম লস আরও কমানো গেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব।
কর্মশালায় বক্তারা সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে বুয়েটের অধ্যাপক ড. আমান উদ্দিন, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাসিবুল হাসান, বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী জাফর সাদিকসহ জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আইইবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট (এইচআরডি) প্রকৌশলী শেখ আল আমিন।
কর্মশালায় আইইবির কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য, বিভিন্ন প্রকৌশল সংগঠনের প্রতিনিধি এবং জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।