দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঘোড়া বেপরোয়াভাবে তছনছ করে দিচ্ছে জীবনযাত্রা। চিনির মূল্যে কিছুতেই লাগাম পরানো যাচ্ছে না! এযেনো লাগামহীন ঘোড়া। দফায় দফায় বৈঠক, আলোচনা, পরামর্শ, নির্দেশনা– কোনো কিছুই কাজে আসছে না। গত কয়েকদিন ধরে বাণিজ্যমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করিয়া গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে যেমনটা বলা হইয়াছে, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন- বিটিটিসির সুপারিশ অনুযায়ী ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজি খোলা চিনি ১২০ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনি ১২৫ টাকা মূল্যে বিক্রয় করিবার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকার চিনিকল মালিকদের সমিতিকে নির্দেশনা দিয়াছিল। কিন্তু বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি খোলা ও প্যাকেটজাত চিনি বিক্রয় করা হইতেছে ১৩৫ হইতে ১৪০ টাকায়। অধিকতর পরিহাসের বিষয়, সরকার অধিক মূল্যে চিনি বিক্রয়কারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিলেও ব্যবসায়ীরা আপন খেয়ালেই চলিতেছেন। নিত্যপণ্যটির বিক্রয়মূল্য বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা এই প্রথম উপেক্ষিত হইল, এমন নহে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ৭ এপ্রিল খোলা চিনি ১০৪ এবং প্যাকেটজাত চিনির কেজি ১০৯ টাকা নির্ধারণ করিয়াছিল। মূলত তখন হইতেই খুচরা পর্যায়ে চিনি বিক্রয় হইতেছিল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা দরে। ইহার পূর্বে গত ফেব্রুয়ারিতে চিনি আমদানির শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করা হয়। কিন্তু উহারও সংগত পরিমাণ প্রতিফলন বাজারে পরিলক্ষিত হয় নাই। এইদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবি নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য চলমান কর্মসূচির অধীনে চিনির মূল্য বৃদ্ধি করিয়া প্রতি কেজি ৭০ টাকা ধার্য করিয়াছে। ফলে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য কোনো দিক হইতেই স্বস্তিদায়ক খবর নাই। বলা বাহুল্য, চিনির বাজারের এই গগনচুম্বী অবস্থা এমন সময়ে চলিতেছে, যখন চাউল, ডাউল, ভোজ্যতৈলসহ সকল নিত্যপণ্যই সাধারণ ভোক্তাদের আয়ত্তের বাহিরে রহিয়াছে। শুধু উহাই নহে; বিগত কয়েক মাসে দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়াছে; অন্যদিকে অধিকাংশ মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির পরিবর্তে বরং হ্রাস পাইয়াছে।
চিনি আমদানিকারকরা মূল্যবৃদ্ধির জন্য বিশেষত বিশ্ববাজারে পণ্যটির মূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ডলার সংকটকে দায়ী করিলেও খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন ‘কেহ কেহ বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ লইতেছেন।’ আমরাও এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে ইতোপূর্বে একাধিকবার বলিয়াছি, বিশেষত চিনি ও ভোজ্যতৈলের বাজার কতিপয় বৃহৎ ব্যবসায়ীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রহিয়াছে বিধায় তথায় ‘সিন্ডিকেট’ সক্রিয় থাকার অভিযোগ উড়াইয়া দেওয়া যায় না। কিন্তু যাহা হতাশাজনক, অদ্যাবধি ভোক্তা অধিদপ্তর বা ভোক্তাস্বার্থ সুরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য সকল সংস্থা মাঝেমধ্যে খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জনদৃষ্টি আকর্ষণের মতো কিছু অভিযান চালাইয়াই দায়িত্ব সমাপ্ত করিয়াছে। আমরা মনে করি, তথায় বিদ্যমান অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূরীকরণ এবং উপযুক্ত আধুনিকায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীনস্থ চিনিকলসমূহের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করিলে চিনির বাজারে উক্ত বৃহৎ ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়িত। পরিণামে বিশ্ববাজারের উথালপাথাল পরিস্থিতিতেও ভোক্তাকুল স্বস্তি পাইত। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হইল, মূলত সীমিত উৎপাদন ক্ষমতার কারণে ঐ সংস্থার নিকট এখন খোলাবাজারে ছাড়িবার মতো যথেষ্ট চিনি নাই। উল্লেখ্য, দেশে বৎসরে চিনির চাহিদা ১৮ লক্ষ টন, আর চিনি শিল্প করপোরেশনের মিলগুলি গত অর্থবৎসরে উৎপাদন করিয়াছে ২৫ সহস্র টনেরও কম।
অনস্বীকার্য, দেশের ভোগ্যপণ্য খাতসহ সমগ্র অর্থনীতিতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অবদান অপরিসীম। উপরন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকারের ভূমিকা সাধারণত বেসরকারি খাতের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয় না। তবে ইহাও সত্য, রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ কিংবা জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার সহিত সরাসরি সম্পর্কিত এমন কিছু পণ্য থাকে, যেগুলি শতভাগ বেসরকারি খাতে ছাড়িয়া দেওয়া হয় না। চিনি ও ভোজ্যতৈলের মতন পণ্যসমূহ এমনই গুরুত্ব বহন করে। অতএব, অন্তত এখানে বে-লাগাম মুক্তবাজার চলে না। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার বিষয়টা অনুধাবন করিবে এবং চিনিসহ নিত্যপণ্যের বাজারে লাগাম পরাইবার লক্ষ্যে দ্রুত প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ লইবে।