সহশিক্ষা নিয়ে আমরা কে কি ভাবছি ? সুশীল সমাজ মনে করেন ভাববার প্রয়োজন রয়েছে। এক বেসরকারি সংগঠনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি পুরুষের চেয়ে মহিলার সংখ্যা বেশি। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বলে কোনো কথা নেই, যেই অনুষ্ঠানে মহিলার সংখ্যা বেশি। পুরুষের সংখ্যা একেবারে কম। বেশি-কম প্রশ্নে আমি যাচ্ছি না। বেশ কয়েকজন মহিলার জটলা দেখে একটু দূরে গিয়ে একটা চেয়ারে বসে শুনছি এক মহিলার দরাজ গলার কিছু কথা। তিনি বলছেন, আমার মেয়েকে পুরুষের সংস্পর্শে যেতে দিই না। দেশের যা হাল অবস্থা চলছে। স্কুলের পাঠ চুকিয়ে আমার মেয়েকে মহিলা কলেজে ভর্তি করাবো। পরজন বললো, কলেজে কি সকল শিক্ষক মহিলা, পুরুষ নেই। উত্তরে বললো, পুরুষ-মহিলা শিক্ষক আছে ঠিকই। শিক্ষার্থীতো আর পুরুষ নেই।
তাদের কথাগুলো শোনে নিজেকে বড়ই অসহায় লাগলো। ভাগ্যিস পরক্ষণেই তিনজন পুরুষ এসে আমার পাশে বসলো। তখন অহায়ত্ববোধটা কেটে গেলো। এ সমস্ত আলাপ-আলোচনা শোনে ভাবলাম সহশিক্ষা বিষয়ে লিখবো।
পুরুষকে উর্ধ্বে, মহিলাকে নিচে রাখবো এই মানসিকতা আমার নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা সকলে সমান। সহশিক্ষা বিষয়ে অতীতের দিকে যাচ্ছি। শুধু বর্তমানকে নিয়ে ভাবলে হবে না, অতীতকেও বর্তমানের সাথে সংমিশ্রণ করা গেলে শুভফল আশা করা যায়।
রামায়ণ এবং মহাভারতের যুগে আমরা দেখতে পাই এক গুরুর পদতলে মহিলা-পুরুষ বিদ্যাশিক্ষা করেছে। কচ ও দেবযানীর উপাখ্যানে দৃষ্ট-শুক্রাচার্যের নিকট বিদ্যা গ্রহণকালে উভয়ের মনোরোম ভাব। বৈদিক যুগেও ঋষিদের পুণ্য তপোবনে ঋষিকন্যা এবং ঋষিপুত্রের বেদ-বেদান্ত উচ্চারণে মুখরিত ছিলো বিদ্যাস্থান। তখন শিক্ষায় নারী পুরুষের সমান সুযোগ-সুবিধা এবং অধিকার বিদ্যমান। সমাজের মাপকাঠিতে তখন শিক্ষাকে এতো বিচার করা হতো না। শিক্ষা তখনও সমাজের কঠিন নাগপাশের বাঁধনে পিষ্ট হয়নি।
তখন যদি বিদ্যা শিক্ষার অবাধ সুযোগ সুবিধা না থাকতো তাহলে গার্গী, খনা, লীলাবতীর নাম আমরা জানতাম না। সূত্রমতে, মনুর সময়ে অবশ্য সহশিক্ষার প্রচলন কিছুটা অঙ্গহানি হয়েছিলো। এ সমস্যা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, সহসা কেটে উঠতে সক্ষম হয়েছিলো তখনকার সাধারণ জনগণ। মূলতঃ এর আবার অভূত্থান ঘটেছিলো বৌদ্ধ যুগে। কতো বৌদ্ধ ভিক্ষু-ভিক্ষুণী একই গুরুর নিকট বিদ্যালাভ করে ধন্য হয়েছিলো। ভবভূতির উত্তর রামচরিতেও সহশিক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
মুসলমান যুগে পর্দা প্রথার প্রচলনে সহশিক্ষা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। বর্তমানে সেই আগের অবস্থা এখন অবশ্য নেই। যা আমাদের জন্যে এক বিরাট সুখবর। গ্রামীণ পরিবেশে আমি যখন বিদ্যাশিক্ষার জন্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে শুরু করি তখন থেকে অদ্যাবধি যা পেরিয়ে এলাম তাতে কিন্তু তেমন বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়নি। স্কুল-কলেজে ছাত্র-ছাত্রী সম্মিলিতভাবে বিদ্যাশিক্ষা করেছে। যুগের প্রয়োজনে মহিলা স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আগামীতেও এপ্রথা অব্যাহত থাকবে এটা যেমন সত্যি কথা তেমনি আমরা ভুলে গেলে চলবে না যে সহশিক্ষা বন্ধ হয়ে গেছে। অধিকাংশ স্কুল -কলেজে ছাত্র-ছাত্রীরা সম্মিলিতভাবে বিদ্যাশিক্ষা করে যাচ্ছে।
মূলতঃ স্বাধীন সমাজ ব্যবস্থাকে ভিত্তি করেই সহশিক্ষার প্রচলন গড়ে উঠেছে। এর সুফল এবং কুফল থাকলেও চুলছেড়া বিচারে সুফলের পাল্লাই ভারি হবে। কারণ নারী পুরুষ একই সমাজের অঙ্গ, একে অপরের পরিপূরক। সহশিক্ষার মাধ্যমে একে অপরের সান্নিধ্যে আসে, উভয়ের জড়তা, অসম্পূর্ণতা কেটে যায়। এক পর্যায়ে পারস্পরিক একটা সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। যাতে কোনো কৃত্রিমতা থাকে না, একে অপরের নিকট অর্থোলোোোলহীন জিজ্ঞেসা হয়ে থাকে না। সহশিক্ষার গুণে রহস্যের কুজ্ঝটিকা অপসারিত হয়, সম্পর্কও সহজ, সুস্থ এবং নিষ্কলুষ হয়। সমাজে এর কুটিল কটাক্ষপাত না থাকলে সহশিক্ষার প্রভাবের ফল সাধারণ ভালো দিকনির্দেশনার ইঙ্গিতবহ।
একটি স্বাভাবিক নিয়ম এবং সত্য কথা হলো, নারীরা প্রকৃতিগত গুণে পুরুষের চেয়ে কি শারীরিক, কি মানসিক উভয় দিকে পিছিয়ে। ক্ষেত্র বিশেষে ব্যতিক্রমও ঘটতে পারে। সহশিক্ষার ফলে নারীর হৃদয়ে পুরুষকে ডিঙ্গিয়ে যাওয়ার একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগে। সর্বদা সহযোগীতা এবং সহযোগিতার ফলে তার ভিতরের সদগুণ সক্রিয় হয়। একটি বিকশিত জীবনের অধিকারী হয়। নারী ও পুরুষের কর্মক্ষেত্র একেবারে ভিন্ন হতে পারে না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এক এবং অভিন্ন।
যেখানে বিভিন্নতা আছে সেখানেও উভয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর এবং অবিচ্ছেদ্য। সুতরাং কর্মক্ষেত্রের নিগুঢ় ঐক্যের দিক দিয়ে বিচার করলে সহশিক্ষা সময় উপযোগী বলে মনে হবে। সমাজের কূপমন্ডুকতা, কুসংস্কার এবং সংকীর্ণতা দূরীকরণের একটা পথ হচ্ছে সহশিক্ষা প্রবর্তন। সহশিক্ষা প্রবর্তনের বিরোধিতাও করে কেউ কেউ। এদের সংখ্যা হাতেগোনা হলেও তারা বলতে চায় আমাদের দেশে সহশিক্ষা ফলপ্রসূ হবে না। সমাজের ভাবধারা, আধ্যত্মিক ভাবাদর্শ ও নারীচার্য সহশিক্ষার পরিপন্থী। সহশিক্ষা প্রবর্তনের ফলে আমাদের দেশের কৃষ্টি ও ঐতিহ্যে আঘাত আসবে, সমাজ ব্যবস্থায় সৃষ্টি হবে নানা অনাচার, নারী তার স্বাভাবিক মধুময় মনোবৃত্তিগুলো হারিয়ে ফেলবে। লজ্জা, লাবণ্য ও মাধুরিবর্জিত নারীরা দলবদ্ধভাবে বের হয়ে আসবে।
উন্নয়নশীল রাষ্টগুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাই নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কোনো কৃত্রিমতার ছোঁয়া নেই। তাদের মধ্যে মৈত্রীময় স্বভাবসুলভ আচরণের সৃষ্টি হয়। একমাত্র সহশিক্ষার কারণে বৈষম্য যেখানে থাকে সেখানে উন্নতির সোপান ধাপে ধাপে বাধাগ্রস্ত হয়। বড়ই পরিতাপের বিষয় হলো আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ এর বিপরীতে।
সময় সম্পূর্ণ পালটে গেছে। সকল ব্যবস্থায় যখন রং বদলাতে শুরু করেছে এদেশের সমাজ ব্যবস্থাও এক্ষেত্রে বাদ যাচ্ছে না। নারীরা অনেক সচেতন হয়েছে। সহশিক্ষা প্রচলনের পাশাপাশি নারী শিক্ষার হার আশানুরূপ বেড়েছে। যা জাতির জন্যে সুখবর। স্কুল বা কলেজে আগে মেয়েরা পুরুষের সামনে কোণঠাসা হয়ে বসলেও এ অবস্থার পুরোপুরি পরিবর্তন হয়েছে। কারণ পুরুষের পাশাপাশি নারীরা দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে বর্তমানে।
সহশিক্ষা সম্বন্ধে পাশ্চাত্য দেশগুলোতে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। কিন্তু কোনো দেশই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যেতে পারছে না। গত বিশ বছর ধরে সোভিয়েত রাশিয়া এবিষয়ে বহু গবেষণা চালিয়েছে। সহশিক্ষার বিষয়ে কটাক্ষপাত করলেও আজ পর্যন্ত একে বাদ দিয়ে চলা সম্ভব হয়নি। প্রশ্ন হচ্ছে সহশিক্ষা কোন্ পর্যায় থেকে শুরু হবে। মাধ্যমিক ও কলেজীয় শিক্ষায় সহশিক্ষার কোনো স্থান হওয়া উচিত নয়। মনোবিজ্ঞানীবিদগণও বলেন এ ব্যবস্থা সমাজ ও সংসারের পক্ষে কল্যাণপ্রসূ।
উচ্চতর শিক্ষা এবং বিজ্ঞান শিক্ষার জন্যে সহশিক্ষা ব্যতিত অন্য কোনো পথই হতে পারে না। পুরুষ এবং মেয়ে উভয়েই Curriculum একই প্রকারের। কাজেই একই স্থানে থেকে লেখাপড়া তথা শিক্ষা লাভ করতে পারলে উভয়পক্ষের সুবিধা। সহশিক্ষার ফলে চরিত্রের দৃঢ়তা বহুলাংশে বর্ধিত হয়।
শেষ কথা : পুরুষ এবং নারীর সমবেত চেষ্টায় সমাজ গড়ে উঠে। কর্মক্ষেত্রে নারীকে যদি পুরুষের অবাধ সান্নিধ্যে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করতে হয় তাহলে পৃথক শিক্ষার ব্যবস্থা চালু রাখার কোনো সার্থকতাই থাকে না। নারীর স্বাধিকার, আত্মপ্রতিষ্ঠার দাবি যদি স্বীকৃতই হয় তাহলে তাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে শিক্ষার আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রেই সহশিক্ষার প্রবর্তন করা এক অপরিহার্য বিষয়।
লেখক : শতদল বড়ুয়া
সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং প্রাবন্ধিক