প্রকৃতির বৈরিতা আর ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার দ্বিমুখী চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বোরো চাষিরা।
একদিকে পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার আতঙ্ক, অন্যদিকে উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের অস্বাভাবিক কম দাম সব মিলিয়ে স্বপ্নভঙ্গের কান্নায় ভাসছেন জেলার লক্ষাধিক কৃষক।
চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। কিন্তু ধান কাটার ভরা মৌসুমে কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। শাল্লা উপজেলার চাকুয়া গ্রামের কৃষক কৃপেশ দাস জানান, প্রতি কিয়ার জমিতে উৎপাদন খরচ বাদেও যেভাবে সার, বীজ, ডিজেল ও শ্রমিকের দাম বেড়েছে, তাতে মণপ্রতি খরচ পড়ছে প্রায় ১,০০০ টাকা। অথচ বাজারে ভেজা ধান বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৬৩০ থেকে ৬৭০ টাকা দরে। গত বছরের তুলনায় মণপ্রতি অন্তত ২০০ টাকা কম পাওয়ায় কৃষকরা বলছেন, “ধান চাষ এখন অভিশাপে পরিণত হয়েছে।
বৈশাখ শুরুর পর থেকে অবিরাম বৃষ্টি আর রোদের অভাব ধান শুকানোর খলাগুলোকেও ভিজিয়ে রেখেছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সতর্কতা বলছে, পাহাড়ি ঢলে সুরমা, কুশিয়ারা ও বৌলাইসহ নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। যে কোনো সময় আগাম বন্যার কবলে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা নিচু এলাকার কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ধান শুকাতে না পারায় বাধ্য হয়েই অনেকে কাঁচা ধান পানির দামে পাইকারদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন।
হাওরের কৃষকদের দাবি, তাদের হাতের নাগালে অটোমেটিক রাইস মিল নেই। জেলায় যে কয়েকটি মিল রয়েছে, সেগুলোও হাওর থেকে দূরে। এছাড়া মিল মালিকরা সরকারি চাল সরবরাহের চুক্তিতে ব্যস্ত থাকায় সাধারণ কৃষকের ভেজা ধান প্রক্রিয়া করার সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে কোনো প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়াই কৃষকরা মহাজনদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ছেন।
ধানের এই সংকটের বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। তিনি কৃষকদের উৎপাদন খরচের কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকারিভাবে ধানের ক্রয়মূল্য মণপ্রতি ১৫০০ টাকা নির্ধারণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস জানিয়েছে, তারা প্রতি কেজি ধানের মূল্য ৩৭ টাকা (মণপ্রতি ১৪৮০ টাকা) নির্ধারণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। এ বিষয়ে বুধবার মন্ত্রণালয়ে একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানিয়েছেন, ফসল রক্ষায় জেলাজুড়ে বর্তমানে ৬০২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ১৪৬টি রিপার মেশিন দিয়ে দ্রুত ধান কাটার চেষ্টা চলছে।
হাওরের ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান এখন সোনালী স্বপ্ন নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষক আব্দুস ছাত্তারের ভাষায়, “এমন দুর্যোগ ও দুর্ভোগের বৈশাখ গত কয়েক বছরে দেখিনি।” এখন কেবল সরকারি সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছেন সুনামগঞ্জের প্রান্তিক কৃষকরা—সরকার কি তবে সময়মতো ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে তাদের রক্ষা করবে?