এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীকে ‘মৎস্য হেরিটেজ’ ঘোষণার পর এর অস্তিত্ব রক্ষায় শুরু হয়েছে নতুন এক কর্মযজ্ঞ।
হালদার প্রাণ সঞ্চার ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে নদীর উজানে শুরু হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচি। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে হারানো স্রোত ফিরিয়ে আনার এই লড়াইয়ে কাজ করছেন কয়েকশ শ্রমিক, যার লক্ষ্য হালদাকে তার আদি রূপ ফিরিয়ে দেওয়া।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে হালদার উজান সালদা অংশে ৪৭৬ জন শ্রমিকের কর্মতৎপরতায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। দুই কিলোমিটার খনন কাজে লেভেলিং, ড্রেসিং ও ঘাসের চাপড়া লাগানোর কাজ ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হয়েছে। অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় এই বিশাল উদ্যোগ স্থানীয়দের মাঝেও আশার সঞ্চার করেছে।
উজানে হালদার খনন কাজ পরিদর্শন করেন মানিকছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) কাজী মাসুদুর রহমান ও তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান। এক সপ্তাহের কাজের অগ্রগতি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের হাসুকপাড়ার ঝিরি থেকে হালদার উৎপত্তি। এরপর মানিকছড়ি হয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, রাউজান ও হাটহাজারী দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি কর্ণফুলী নদীতে মিশেছে। ৯৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদী ও তীরবর্তী এলাকাকে ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর ‘মৎস্য হেরিটেজ’ঘোষণা করে সরকার। ১৬টি কঠোর শর্ত সম্বলিত গেজেট প্রকাশের পর থেকেই নদীর শাখা-প্রশাখায় পানির প্রবাহ ঠিক রাখা এখন অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এরপর প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচিতে হালদাকে অন্তর্ভুক্ত করে ২৭ এপ্রিল অনানুষ্ঠানিকভাবে খনন কাজের উদ্বোধন করা হয়।
পিআইও কাজী মাসুদুর রহমান জানান, ৪৩ দিনের এই কর্মসূচিতে প্রাথমিকভাবে ৫ কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও শ্রমিকদের কাজের গতি অভাবনীয়। নির্ধারিত সময়ে ও বরাদ্দকৃত অর্থে আরও বেশি পথ খনন করা সম্ভব হবে। মূলত মরা খাল পুনরুদ্ধার করে মাছের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরে মানিকছড়ি অংশের প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার এলাকা পাহাড়ি মাটিতে ভরাট হয়ে হালদার অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিল। পাহাড়ের সেই পলি ও মাটির স্তূপ সরিয়ে পানির ধারা অবারিত করার মাধ্যমে হালদার প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষমতা পুনরুজ্জীবিত করার স্বপ্ন দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। স্থানীয়রা মনে করছেন, এই খনন কাজ শেষ হলে হালদা আবার তার পুরোনো যৌবন ফিরে পাবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৪৩ দিনের এই কর্মসূচিতে প্রায় ৫ কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গত এক সপ্তাহে সালদা অংশে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় খনন, লেভেলিং, ড্রেসিং এবং ঘাসের চাপড়া লাগানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক কোটি টাকা। কাজের গতি সন্তোষজনক হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি খনন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর সরকার হালদা নদীর ৯৩ হাজার ৬১২টি দাগের ২৩ হাজার ৪২২ একর এলাকাকে ‘মৎস্য হেরিটেজ’ ঘোষণা করে এবং এতে ১৬টি শর্ত আরোপ করা হয়। এরপর থেকেই নদীর উজানে পরিবেশ বিরোধী সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মানিকছড়ি অংশে পাহাড়ী মাটিতে ভরাট হয়ে যাওয়া ১০-১২ কিলোমিটার মরা খাল পুনরুদ্ধার করা গেলে মাছের অবাধ বিচরণ ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত হবে।