সুনামগঞ্জ জেলাজুড়ে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে জনজীবন ও জনস্বাস্থ্য এখন চরম ঝুঁকির মুখে।
গত কয়েক দিন ধরে জেলা শহরসহ উপজেলাগুলোতে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে দিনের অধিকাংশ সময় অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে ৪ লাখ ৫৩ হাজারেরও বেশি গ্রাহককে। প্রচণ্ড গরম আর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে অচল হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান।
সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর তথ্যমতে, জেলায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের প্রাপ্তি এখন তলানিতে। শহর এলাকার ৩৫ হাজার গ্রাহকের জন্য প্রতিদিন ১২-১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪ থেকে ৫ মেগাওয়াট। প্রায় ৪ লাখ গ্রাহকের এই সমিতির দিনে চাহিদা ৩৫-৪৫ মেগাওয়াট এবং রাতে ৫৫-৬৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে প্রাপ্তি ঘটছে মাত্র ১৯ মেগাওয়াট বা তারও কম। ১৯ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে ৬ মেগাওয়াট চাহিদার স্থলে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২ মেগাওয়াট।
সামনে এসএসসি পরীক্ষা থাকলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে প্রস্তুতি নিতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। শহরের কালীবাড়ির পরীক্ষার্থী মানশিকা রায় দীয়া জানায়, কয়েক মিনিট পরপর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় এবং প্রচণ্ড গরমে বইয়ের টেবিলে বসা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বড়পাড়ার বাসিন্দা এহসান মমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দিনে বিদ্যুৎ না থাকায় কাজ করা যায় না, আর রাতে গরমের জন্য ঘুমানো যায় না। বিদ্যুৎ অফিসে ফোন দিলে শুধু বলে লোডশেডিং চলছে।”
বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও। সন্ধ্যা ৭টার পর মার্কেট বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনার পাশাপাশি দিনের বেলা বিদ্যুৎ না থাকায় লোকসানের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছে না।
জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে বিদ্যুৎ না থাকায়। পাম্পগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকায় তেল নিতে আসা যানবাহন চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, যা যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির এই অবনতির কথা স্বীকার করেছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। সুনামগঞ্জ পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাসেল আহমদ জানান, চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি অত্যন্ত কম হওয়ায় বাধ্য হয়েই ফিডার বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এই অবস্থার অবসান কবে হবে সে বিষয়ে তাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
সুনামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মিলন কুমার কুন্ডু বলেন, “চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় সব শ্রেণির গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়েছেন। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের ফিডার নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে।”
সুনামগঞ্জের এই বিদ্যুৎ সংকট কেবল একটি কারিগরি সমস্যা নয়, বরং এটি এখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণ মানুষের দাবি, এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক, অন্যথায় জনদুর্ভোগ আরও চরম আকার ধারণ করবে।