কক্সবাজারে নজরদারি জোরদারের পর ইয়াবা পাচারের নতুন রুট হিসেবে আলোচনায় এসেছে চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা আনোয়ারা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, সমুদ্রপথে মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার বড় একটি অংশ এখন আনোয়ারার বিভিন্ন উপকূলীয় পয়েন্ট ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। নিয়মিত ছোট-বড় চালান ধরা পড়লেও চক্রের মূল হোতারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
স্থানীয়ভাবে গহিরা, রায়পুর, পারকি সৈকত, বরুমচড়া ও জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের কয়েকটি ট্রলারঘাটকে ইয়াবা খালাসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। উপকূলীয় ভৌগোলিক অবস্থান, বিস্তৃত জলপথ এবং বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল পাচারকারীদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, মিয়ানমার থেকে সমুদ্রপথে ইয়াবার চালান প্রথমে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন পয়েন্টে পৌঁছে। পরে মাছ ধরার ট্রলার ও জেলেদের আড়ালে এসব চালান আনোয়ারার উপকূলে খালাস করা হয়। সেখান থেকে সড়কপথে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
অভিযানে ধরা পড়ে বাহক, অধরা মূল হোতারা
গত কয়েক বছরে আনোয়ারা ও আশপাশের এলাকায় একাধিক বড় অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। র্যাব, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সংস্থার অভিযানে কয়েক লাখ ইয়াবাসহ বহু ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা বাহক বা মাঠপর্যায়ের কারবারি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
র্যাব-৭-এর সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এআরএম মোজাফফর হোসেন বলেন, আনোয়ারা উপকূলকে ব্যবহার করে ইয়াবা পাচারের চেষ্টা ঠেকাতে র্যাব নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করছে। মাদকচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বাহিনী।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়লেও পাচারকারীরা কৌশল বদলে নতুন নতুন রুট ব্যবহার করছে। ফলে মাদকবিরোধী অভিযানকে আরও সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার প্রয়োজন রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্রের দাবি, অতীতে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার কারণে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনায় নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। অভিযানের আগাম তথ্য ফাঁস হওয়া কিংবা প্রভাব খাটিয়ে অভিযানে প্রতিবন্ধকতা তৈরির অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের উদ্বেগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপকূলীয় এলাকায় মাদক পাচার অব্যাহত থাকায় তরুণদের একটি অংশ মাদকের ঝুঁকিতে পড়ছে। একই সঙ্গে অপরাধপ্রবণতাও বাড়ছে।
আনোয়ারা নাগরিক ফোরামের সভাপতি আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী কুসুম বলেন, মাদক পাচার ও মাদকসেবন রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি। শুধু বাহক নয়, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
নজরদারি বাড়ানোর দাবি
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উপকূলীয় জলসীমায় টহল জোরদার, ট্রলারঘাটগুলোতে নিয়মিত নজরদারি এবং গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান বাড়ানো গেলে ইয়াবা পাচার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে চিহ্নিত গডফাদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে মাদক পাচার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে।
তাদের মতে, আনোয়ারাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই মাদক নেটওয়ার্ক শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদকের বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। ফলে বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।