যশোরের জয়তী সোসাইটির পরিচালক অর্চনা বিশ্বাসের পুরো জীবনই সংগ্রামের, তাকে দেখে অনেক নারী উজ্জীবিত হন। তিনি অতীতে নারীদের পাশে ছিলেন। এখনো আছেন। ভবিষ্যতেও থাকবেন। অর্চনা বিশ্বাস কেবল সংগ্রামী না, যশোরে কর্মমুখী নারীদের প্রতিচ্ছবি।
তিনি নড়াইলের নলদীর চর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার মায়ের নাম উর্মিলা। বাবা পুলিন বিশ্বাস। সাত ভাই বোনের মধ্যে তিনি বড়। ছোট বেলা থেকেই গ্রামীণ নারী ও গরিব মানুষের শ্রেণিবৈষম্য, নির্যাতন, অসমতার বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেন। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় স্কুল জীবনেই।
তিনি স্কুলে এবং গ্রামে ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে মেয়েদের সংঘবদ্ধ করে প্রতিবাদ করেন। সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় সরকারের রোষানলে পড়েন অর্চনা বিশ্বাস। হুলিয়া হয় তার বিরুদ্ধে। এ কারণে আত্মগোপনে থেকে কাজ চালিয়ে যান তিনি। এ ধরনের কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হয় একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য নাজিম উদ্দীনের সঙ্গে। তারা প্রেমজ সূত্রে ১৯৭৬ সালের নভেম্বর মাসে বিয়ে করেন। নাজিম উদ্দিন যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার বাসিন্দা।
মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করার কারণে সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হন নাজিম-অর্চনা। এরপর সামাজিক অনেক বাধা পেরিয়ে যশোর শহরে এসে বসবাস শুরু করেন তারা। কোনো রকম আর্থিক সহযোগিতা পাননি শ্বশুর ও বাবার বাড়ি থেকে। রাজনৈতিক কারণে স্বামী নাজিম উদ্দিন জেলে থাকায় সংসারে নেমে আসে চরম সংকট। অজপাড়াগাঁয়ের মেয়ে অর্চনার লেখাপড়া শেখা না হওয়ায় ভালো কোনো চাকরি করার উপায় ছিল না। এ কারণে বাধ্য হয়ে যশোর শহরের একটি বস্তিতে স্যাঁতসেঁতে ছোট্ট ঘরে ছেলেকে নিয়ে শুরু করেন জীবন সংগ্রাম।
এরই মধ্যে পরিচয় হয় জাগরণী চক্রের নির্বাহী পরিচালক আজাদুল কবির আরজুর সঙ্গে। তিনি বস্তিতে তিনশ’ টাকা বেতনে শিক্ষা সেবিকার কাজ করার প্রস্তাব দেন অর্চনাকে। বস্তিতে কাজ করার সময় তিনি দেখতে পান সমাজের মানুষের দুর্দশার চিত্র। অর্চনা মনে করেন নারীদের ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন। অর্থনৈতিকভাবে নারীরা স্বাবলম্বী হলেই তাদের ওপর নির্যাতন, অবহেলা, অসম্মান কমে যাবে। এসব বিবেচনা করে তিনি প্রথমে নিজেই পড়ালেখা শুরু করেন।
১৯৮৩ সালে এসএসসি, ১৯৮৫ সালে এইচএসসি, ১৯৮৭ সালে বিএ এবং ১৯৯০ সালে এমএসএস পাস করেন। ১৯৭৯ সালে বস্তিতে শিক্ষা সেবিকা হিসেবে কাজ শুরু করলেও পরবর্তীতে শিশু শিক্ষা প্রকল্পের শিক্ষক, শিক্ষা সমন্বয়কারী, কর্মসূচি সমন্বয়কারী, প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী এবং প্রকল্প পরিচালক পদে উন্নীত হন।
চাকরি চলাকালীন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইংল্যান্ড, লাওস, হংকং, নেপাল, জাপান ও ভারতে যান। জয়তী সোসাইটি নারী ও শিশু উন্নয়নমূলক একটি প্রতিষ্ঠান। যশোর শহর ও শহরতলিতে গড়ে ওঠা ৫৪টি নারী সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে জয়তী সোসাইটি। ‘নিজেরাই করবো নিজেদের উন্নয়ন’ স্বপ্নকে সামনে নিয়ে ২০০২ সালের ৭ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে জয়তী সোসাইটির পথচলা শুরু হয়। নারীদের স্বনির্ভর হওয়ার পথ দেখানো জয়তী সোসাইটির বর্তমান সদস্য সংখ্যা ২৮ হাজার। তারা সবাই নারী। এসব নারীর মধ্যে ১ হাজার ৮০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে জয়তী সোসাইটিতে।
জয়তী সোসাইটির মোট কর্মীর ৯৮ শতাংশই নারী। পুরুষ কর্মী মাত্র ২ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অর্চনা বিশ্বাস। অর্চনা বিশ্বাস বলেন, জয়তী সোসাইটির বিভিন্ন ব্যবসা উদ্যোগ থেকে যে আয় হয়, তা থেকেই কর্মীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। ব্যবসা উদ্যোগ থেকে যে লাভ হয়, তা দিয়ে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মকা- পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব কর্মকা-ে নারীরাই প্রাধান্য পাচ্ছেন। যশোরের রেলগেট মুজিব সড়কে সাড়ে সাত কাঠা জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে ‘জয়তী ভবন’।
ভবনটিতে রয়েছে জয়তী হেঁশেল (বাংলা রেস্টুরেন্ট), জয়তী ফাস্ট ফুড, জয়তী চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, জয়তী পিৎজা ট্রি, জয়তী বিউটি পারলার, জয়তী ফিটনেস সেন্টার, জয়তী কনফারেন্স রুম (৫টি), জয়তী কমিউনিটি সেন্টার, জয়তী কারাতে সেন্টার (নারী ও শিশুদের জন্য), জয়তী গেস্টহাউস, জয়তী স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র, জয়তী বডি ম্যাসাজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। জয়তী সোসাইটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ঢেঁকিছাঁটা চাল, ভেজালমুক্ত আচার ও গুঁড়া মসলা তৈরি করে বিক্রি করছে। আছে কালোজিরা, নারিকেল, তিল, সরিষা ও বাদামের তেল। মৌসুম অনুযায়ী তারা ফুল, গুড়, আম, সবজিসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে।
তিনি অর্চনা বিশ^াস বলেন, সংগঠন তৈরির মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং গরিব নারী ও শিশুর অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করে যাচ্ছে জয়তী। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য, অবহেলিত ও সুযোগ বঞ্চিত শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা, নারীদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, সদস্যদের নিজস্ব পুঁজি গঠন, বাল্য বিয়ে, যৌতুক, তালাক, বহুবিবাহ, নারী ও শিশু পাচার, ইভটিজিংসহ সকল প্রকার অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা, সদস্যদের আয় বৃদ্ধি করা, কর্ম এলাকায় শিশু ও মহিলাদের নিয়ে আনন্দ ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দিবস, সভা ও সেমিনারে অংশগ্রহণ করা, বয়স্ক মায়েদের সেবা প্রদানে সহায়তা করা।
অর্চনা বিশ্বাস গত বছর বেগম রোকেয়া পদক পেয়েছেন। নারী অধিকার সংরক্ষণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ পদক পেয়েছেন তিনি। এর আগে ২০১৪ সালে তিনি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন জাতীয় পর্যায়ে। এ ছাড়া দেশ-বিদেশ থেকে তিনি অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন।