বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, খরা ও বন্যার প্রকোপ বাড়ছে, প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের নাম “জলবায়ু ধর্মঘট”।
জলবায়ু ধর্মঘট বলতে সাধারণত বোঝানো হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল কিংবা দৈনন্দিন জীবনের কার্যক্রম থেকে কিছু সময়ের জন্য বিরতি নিয়ে জলবায়ু ইস্যুতে প্রতিবাদ বা জনসচেতনতা সৃষ্টির কর্মসূচি।
২০১৮ সালে সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা থানবার্গ যখন একাই স্কুল থেকে অনুপস্থিত থেকে সুইডিশ পার্লামেন্টের সামনে বসে প্রতিবাদ শুরু করেছিলেন, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি এই ছোট্ট উদ্যোগটি বৈশ্বিক এক আন্দোলনে পরিণত হবে। আজ এটি “Fridays for Future” নামে একটি বৈশ্বিক তরুণ আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
বর্তমান বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে জলবায়ু সংকট
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। জাতিসংঘের একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষে।
দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা গুলোতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা—এগুলো যেন এখন নিত্যসঙ্গী। ফলে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবিকা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। লাখ লাখ মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের তরুণরা জলবায়ু ইস্যুতে সোচ্চার হতে শুরু করেছে। বিভিন্ন সংগঠন, যেমনঃ Youthnet for climate justice, Volunteer for Environment International, Bangladesh Youth Climate Network, Fridays for Future Bangladesh সহ অসংখ্য স্থানীয় ও জাতীয় উদ্যোগ জলবায়ু ধর্মঘট ও সচেতনতা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
জলবায়ু ধর্মঘটের গুরুত্ব
বাংলাদেশে জলবায়ু ধর্মঘট মূলত চারটি বিষয়ে আলোকপাত করে—
সচেতনতা সৃষ্টি: জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে তুলে ধরা এবং তাদের উদ্বুদ্ধ করা যাতে তারা নিজেদের ভূমিকাটি বোঝে।
নীতিনির্ধারকদের উপর চাপ সৃষ্টি: সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের জলবায়ু ইস্যুকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য করা। তরুণদের সম্পৃক্ততা: শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজকে একটি গঠনমূলক সামাজিক আন্দোলনের অংশ করে গড়ে তোলা। স্থানীয় সমস্যার বৈশ্বিক সংযোগ: বাংলাদেশের বাস্তবতা আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা এবং বৈশ্বিক সহানুভূতি অর্জন।
বাংলাদেশে জলবায়ু ধর্মঘটের রূপ
বাংলাদেশে জলবায়ু ধর্মঘট সাধারণত রাজধানী ঢাকা এবং কিছু বড় শহরে বেশি দেখা যায়। পোস্টার, ব্যানার, অবস্থান কর্মসূচি, মানববন্ধন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, জলবায়ুবিষয়ক বক্তৃতা—এসব এর অঙ্গ। তবে সম্প্রতি কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগও লক্ষ্য করা গেছে। যেমন, গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে জলবায়ু শিক্ষা ক্যাম্প, স্থানীয় স্কুলে “Climate School Programme”, “সবুজ পাঠশালা” কর্মসূচি, জলবায়ু বার্তা সংবলিত নাটক মঞ্চায়ন, এবং জলবায়ু-বন্ধুবান্ধব বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।
চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
জলবায়ু ধর্মঘটের পথ সহজ নয়। এখনো অনেকেই জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা বুঝে উঠতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রেই তরুণদের আন্দোলনকে ‘ছেলেখেলা’ ভেবে অবজ্ঞা করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কড়াকড়ি, রাজনৈতিক অনীহা এবং মিডিয়ার পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেয়া এই আন্দোলনকে পিছিয়ে দেয়।
তাছাড়া, ধর্মঘট মানেই কাজ বন্ধ করা নয়; বরং এটি একটি প্রতীকী প্রতিবাদ। অনেকেই ভুলভাবে এটিকে ‘নেগেটিভ’ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। এর ফলে অংশগ্রহণ কমে যায় এবং বার্তা পৌঁছাতে সমস্যা হয়।
আমাদের কী করণীয় জলবায়ু শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই এই ইস্যু সম্পর্কে সচেতন হয়।
সরকারি নীতিতে জলবায়ুবান্ধব পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, বিশেষ করে পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়।
তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে, যেমন—জলবায়ু সম্মেলন, ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ, ওয়ার্কশপ, আর্ট ও মিডিয়া ক্যাম্পেইন। স্থানীয় সমস্যাগুলো তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবে জলবায়ু ধর্মঘটকে আরও বিকশিত করতে হবে, যেন তা শুধু শহরকেন্দ্রিক না থেকে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠে।
জলবায়ু ধর্মঘট একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা। এটি শুধু পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ন্যায়বিচারের আন্দোলন। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে এই আন্দোলনের গুরুত্ব আরো বেশি। তরুণ সমাজকে যদি সঠিকভাবে শক্তি ও নেতৃত্ব দিতে পারা যায়, তাহলে জলবায়ু ধর্মঘট শুধু প্রতীকী প্রতিবাদ নয়—এটি হয়ে উঠতে পারে এক বিপ্লবের সূচনা। আর সেই বিপ্লবের মূলে থাকবে একটি সবুজ, টেকসই এবং ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন।
শেখ শাহরুখ ফারহান, লেখক, উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী