গ্রামীণ বাংলাদেশের মায়েদের ওপর অতিরিক্ত গৃহস্থালি দায়িত্ব ও শ্রমনির্ভর কাজের চাপ শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, মায়েরা সন্তানদের যথাযথ যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করলেও গৃহস্থালি কাজ, কৃষিকাজ এবং অন্যান্য অবৈতনিক শ্রমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার কারণে সেই যত্নের ইতিবাচক প্রভাব অনেকাংশে হ্রাস পায়। এর ফলে শিশুদের পুষ্টিগত উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাময়িকী উইমেনস স্টাডিজ ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম (ডব্লিউএসআইএফ) এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. মাহবুব হোসেন। গবেষণায় গ্রামীণ বাংলাদেশের শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতির সঙ্গে মায়েদের সময় বণ্টন, শিশু পরিচর্যা এবং কাজের চাপের আন্তঃসম্পর্ক বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরআই) পরিচালিত বাংলাদেশ সমন্বিত পরিবার জরিপ ( বিআইএইচএস)। দেশব্যাপী ৬ হাজার ৫০০ গ্রামীণ পরিবারের তথ্যের ভিত্তিতে ১ হাজার ৪৪৭ শিশুর পুষ্টিগত অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। শিশুদের পুষ্টির মান নির্ধারণে বয়স অনুযায়ী উচ্চতা এবং বয়স অনুযায়ী ওজনের সূচক ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল মায়ের যত্ন এবং কর্মঘণ্টার পারস্পরিক সম্পর্ক শিশুদের পুষ্টির ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে তা নির্ণয় করা। দীর্ঘদিন ধরে শিশু পুষ্টি বিষয়ে পরিচালিত অধিকাংশ গবেষণায় আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক অবস্থানের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেলেও মায়েদের সময় ব্যবহারের প্রভাব তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত ছিল। নতুন এই গবেষণা সেই শূন্যতা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে মনে করছেন গবেষক ড. মাহবুব।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে নারীদের কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে শিশু পরিচর্যা সহায়তা বা দিবাযত্ন কেন্দ্রের সুবিধা সম্প্রসারিত হয়নি। ফলে অনেক মা একই সঙ্গে গৃহস্থালি কাজ, কৃষিকাজ এবং শিশুর যত্নের দ্বৈত চাপ বহন করছেন।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, মাতৃস্নেহ, পরিচর্যা ও যত্ন শিশুদের পুষ্টি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে মায়েরা যখন গৃহস্থালি কাজ, কৃষিকাজ কিংবা অন্যান্য শ্রমঘন কর্মকাণ্ডে অধিক সময় ব্যয় করেন, তখন সেই যত্নের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। বিশেষ করে অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজে অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে শিশুর পুষ্টিতে যত্নের ইতিবাচক প্রভাব প্রায় পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়। অর্থাৎ একই মাত্রার শিশুযত্ন ভিন্ন ভিন্ন কর্মঘণ্টার কারণে ভিন্ন ফলাফল তৈরি করতে পারে।
সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অধ্যাপক ড. মাহবুব হোসেন। তিনি বলেন, শুধু পুষ্টি কর্মসূচি বা সচেতনতামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করলেই শিশু পুষ্টির সমস্যার সমাধান হবে না। মায়েদের অতিরিক্ত কাজের চাপ কমানোর পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় শিশু পরিচর্যা সহায়তা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, পরিবার ও সমাজভিত্তিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং নারীদের শ্রমের ভার লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ মায়েদের সময় বাঁচাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, জ্বালানি ও পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিশু যত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। মায়েদের সময় ও শ্রমের বিষয়টিকে তাই নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে স্থান না দিলে শিশু পুষ্টি উন্নয়নে গৃহীত কর্মসূচিগুলোর প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন কঠিন হবে।