সোহেল রানা, নওগাঁ থেকে :
পৃথিবীতে যে দুইজন মানুষ আমাদের বেশি আপনজন এবং বেশি ভালোবাসেন, আদর-স্নেহ মমতায় সব সময় আগলে রাখেন তারা হলেন মা-বাবা। আমাদের বিপদাপদ, অসুখে-বিসুখে ছায়ার মতো কাছে থাকেন তারা। নিজে খেয়ে না খেয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তারা সন্তানের ভরণপোষণ করে থাকেন। গর্ভধারিনী মা দীর্ঘ ১০ মাস ১০ দিন গর্ভে ধারণ করে থাকেন। এসব বিষয়াদি একটু চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারবো বাবা-মা কি জিনিস। সন্তানদের ভরণ-পোষণসহ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে নেমে পড়েন আয় উপার্জনের কাজে। হাঁড়ভাঙা খাটুনি খেটে পূরণ করেন সন্তানদের শত আবদার। কিন্তু সন্তাদের কাছে সেই পিতা-মাতার স্থান যদি না হয় উপযুক্ত, তাহলে এর চেয়ে কঠিন নির্মমতা আর কি হতে পারে। ঠিক এমনই এক অসহায় পিতা নওগাঁর ফুটপাতের দোকানি মো. সামছুল আলম (৭৫)। পেটের তাগিতে অসুস্থ শরীর নিয়ে নওগাঁর আদালত প্রাঙ্গণে রাস্তার ফুটপাতে ছোট্ট দোকান দিয়ে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সারাদিন বিক্রিত পণ্য থেকে যে কত টাকাই লাভ হয়, তা দিয়ে ওষুধ ও সাংসারিক খচর যোগাতে হিমশিম খেতে হয়। যখন খুব অসুস্থবোধ করেন, তখন রাস্তায় বসে পন্যগুলো বিক্রি করতে না পারলে সেদিন চুলায় আগুন জ্বলে না। সেই ৯০ দশকের কথা, চার সন্তানের জনক সামছুল আলম নিজ জেলা মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুর থেকে পরিবারসহ নওগাঁতে এসে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। সে সময় নওগাঁতে কাপড়ের ব্যবসা তেমন প্রসিদ্ধ ছিল না। পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে লাভের আশায় নওগাঁ শহরের কাপড়পট্টিতে দোকান ঘরের পজিশন কিনে নিয়ে শুরু করেন কাপড়ের ব্যবসা। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি সামছুল আলমের। ব্যবসার লাভের টাকা নিয়ে শহরের যান। নওগাঁতে জায়গা কিনে বাড়ি করেন তিনি। এরপর ঢাকা শহরে দুই ছেলেকে ব্যবসায় দাঁড় করিয়ে দেন। ব্যবসায় লাভের অংশ দিয়ে ফ্ল্যাট কিনেন দুই ছেলে। নওগাঁতে দুই সন্তানও শুরু করেন কাপড়ের ব্যবসা। ভালোই চলছিল সামছুল আলম এর ব্যবসা ও পরিবার নিয়ে সংসার জীবন।
এরপর ২০০৪ সালে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দুইজন কর্মচারী তার কয়েক লাখ টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যায়। অন্যদিকে সামছুল আলমের প্রস্রাবদ্বারের সমস্যাজনিত কারণে দুটি অপারেশন করতে হয়। ফলে দোকানঘর ও বাকি কাপড়গুলো বিক্রি করে দিতে হয়। তারপর থেকে ব্যবসা ও সংসার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। সামছুল আলম বলেন, ৪ ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছি, তারপর তাদের ব্যবসায় দাঁড় করিয়েছি। দুই ছেলে নওগাঁতে আর দুই ছেলে ঢাকাতে ব্যবসা করে। যখন আমার নিজ হাতে দাঁড় করানো ব্যবসায় ক্ষতি হতে লাগছিল, তখন তাদের সহায়তা চেয়েছিলাম কিন্তু কোনো সন্তান এগিয়ে আসেনি। এমনকি আমার অপারেশন করানোর সময়ও তারা আমার পাশে দাঁড়ায়নি। ভুল তো ছিল তাদের নামে নামে সব কিছু করে দেওয়া।
আমার নিজ হাতে করা বাড়িতেও স্থান হয়নি। বর্তমানে ছোট্ট টিনশেট ঘর ভাড়া নিয়ে আমি আর আমার স্ত্রী কোনো রকমে বসবাস করছি। তিনি বলেন, অনেক আগেই নওগাঁতে এসেছি জীবনে উন্নতি করবো বলে সেটাও করেছিলাম। কিন্তু নিয়তির কাছে হার মেনে আজ রাস্তার পাশে এই অসুস্থ শরীর নিয়ে পেটের তাগিদে শীত কালীন সুরক্ষা সামগ্রীসহ কিছু পণ্য বিক্রি করি। সারাদিন বিক্রি করে ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মত লাভ থাকে, কিন্তু দুইজন মানুষের ওষুধসহ সাংসারিক খরচ চালাতে কত যে কষ্ট হয় তা বোঝাতে পারবো না। তবুও যতদিন বেঁচে আছি কারো কাছে হাত পাতবো না। কান্না বিজরিত কণ্ঠে সামছুল আলম আরও বলেন, সেই ৯০ সালের দিকে নওগাঁতে এসেছি জীবন গড়ার তাগিদে। ভাইবোন আত্মীয়-স্বজন সবাই জন্মস্থান মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরে থাকে। সেই কবে শেষ বারের মত গেছি সঠিক মনে নেই। বর্তমানে চার ছেলের স্ত্রী-সন্তান হয়েছে। তাদের ঘরেই যখন আমাদের মত বৃদ্ধ বাবা-মার স্থান হয়নি, তখন অর্থ দিয়ে দেখাশোনা করার মত সময় বা ইচ্ছা তাদের নেই। কয়েকবার বলেছিলাম সন্তানদের যে- আমরা দুই মা বাবা খুব অসুস্থ সন্তান হিসেবে তোমরা একটু পাশে দাঁড়াও কিন্তু তাদের ইচ্ছা বা সময় নেই।
নিয়তির কাছে আমরা সত্যি বড় অসহায়! সময়ের বির্বতনে রাস্তায় নামতে হবে তা ভাবতে খুব অসহায় বোধ করি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন করুন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে, তা কখনও ভাবিনি। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের পরম আশ্রয়স্থল হয়, সন্তানরা কিন্তু আমাদের বেলায় অবহেলায় হলো পরম পাওয়া। তবুও দোয়া করি তারা স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সুখে থাকুক, ভালো থাকুক কখনো অভিশাপ দেবো না। নিয়তি যেন কখনও তাদের জীবনের পড়ন্ত বেলায় অবহেলার পাত্র না করে তাদের সন্তানদের কাছে।