বাংলাদেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের ঘাটতি। গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এনডিসি ২.০-এর আওতায় ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের শর্তহীন কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার পূরণের পথে থাকলেও শর্তসাপেক্ষে (কন্ডিশনাল) অর্থায়ন ঘাটতির কারণে পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কন্ডিশনাল কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ২৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পেয়েছে মাত্র ১.২৫ শতাংশ অর্থায়ন। ফলে এনডিসি ২.০-এর ৮৯.৪৭ মেট্রিক টন কার্বন ডাই অক্সাইড সমতুল্য (MtCO₂e) নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে বড় বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
‘Bangladesh’s NDC-3.0: Pathways for Ambition, Action, and Finance’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সময়মতো অনুদান নিশ্চিত করা গেলে এনডিসি ৩.০-এর আওতায় পাঁচগুণ বেশি নিঃসরণ কমানো সম্ভব। এটি কোনো দয়া নয়, বরং উন্নত দেশগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায়বিচারের পরীক্ষা।
এনডিসি: যাত্রাপথ ও মূল পরিসংখ্যান
২০১৫ সালে প্রথম এনডিসি জমা দিয়ে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে শর্তহীনভাবে ৫ শতাংশ নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার করে। পরবর্তীতে ২০২১ সালের এনডিসি ২.০-তে লক্ষ্য বাড়িয়ে আনকন্ডিশনাল ৬.৭৩% ও কন্ডিশনাল ২১.৮৫% নির্ধারণ করা হয়। ইতোমধ্যে আনকন্ডিশনাল লক্ষ্যের প্রায় ৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। তবে কন্ডিশনাল লক্ষ্যে অগ্রগতি প্রায় স্থবির।
নতুন এনডিসি ৩.০ অনুযায়ী,
শর্তহীন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য: ৩৯.৫৮ MtCO₂e (BAU-এর ৯.১৫%)
শর্তসাপেক্ষ নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য: ১১৬.৩৫ MtCO₂e (BAU-এর ২৬.৯%)
মোট প্রয়োজনীয় অর্থায়ন: ৩১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (আনকন্ডিশনাল ৪৬.৩৮, কন্ডিশনাল ২৭০.১৩ বিলিয়ন)
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম. জাকির হোসেন খান বলেন,
“এনডিসি বাস্তবায়নে শর্তসাপেক্ষ অর্থায়ন শুধু বাজেটের হিসাব নয়, এটি কার্বন ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ ও পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের কাছে উন্নত দেশগুলোর অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়নের অঙ্গীকার পূরণ করা তাদের ন্যূনতম দায়।”
খাতভিত্তিক রূপান্তরমূলক সম্ভাবনা
শক্তি খাত: ২৪,১০৬ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তির সক্ষমতা স্থাপন করা গেলে ৫৮.২৭ MtCO₂e নিঃসরণ কমানো সম্ভব। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, গ্রিড দক্ষতা, গ্যাস অপ্টিমাইজেশন ও কয়লার ব্যবহার হ্রাসকে প্রাধান্য দিতে হবে।
শিল্প খাত: সিমেন্ট, সার ও ইস্পাত শিল্পে প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে প্রায় ৩.০৯ MtCO₂e নিঃসরণ কমানো যাবে।
কৃষি ও বন: কৃষি-বনায়ন ও ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে ব্লু কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করে রাজস্ব অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
নগর ব্যবস্থা: ঢাকায় এয়ার কন্ডিশনের তাপমাত্রা ২২ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত করলে ৪,৩০২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। সবুজ এলাকা বৃদ্ধি করলে শীতলীকরণের চাহিদা ৫–১৫% কমবে।
পরিবহন: দেশের মোট জ্বালানি নিঃসরণের ৮.৮৬% আসে পরিবহন খাত থেকে। বৈদ্যুতিক যানবাহন, চার্জিং অবকাঠামো ও প্রণোদনা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দূষণ কমার পাশাপাশি কম্পোস্ট ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তবে আইন প্রয়োগ দুর্বল থাকায় সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
চ্যালেঞ্জ ও সুপারিশ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার্ষিক ২.৮৬ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, অপর্যাপ্ত তথ্যভিত্তি এবং সীমিত এমআরভি (Monitoring, Reporting and Verification) ব্যবস্থা এনডিসি বাস্তবায়নের প্রধান বাধা।
প্রধান সুপারিশগুলো হলো:
আন্তর্জাতিক অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন সময়মতো নিশ্চিত করা
তথ্য সংগ্রহে ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহার ও সমন্বয় জোরদার করা
রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের সম্ভাবনা বাড়াতে দূষণ কর ও আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি
নগর পরিকল্পনা ও নাগরিক আচরণকে জলবায়ু নীতির অংশ করা
ব্লু কার্বন, কৃষি-বনায়ন ও টেকসই ভূমি ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়া
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম. জাকির হোসেন খান বলেন, “আগামী CoP30 সম্মেলনই শেষ সতর্কবার্তা। উন্নত দেশগুলো যদি প্রকৃতি ও জলবায়ুবিনাশী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে প্রকৃতির অধিকারভিত্তিক শাসনব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তবে এটি জলবায়ু ন্যায়বিচার ও বৈশ্বিক বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হবে।”