কুষ্টিয়া অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব এবং পরিবেশগত অবক্ষয় মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে কুষ্টিয়া শহরে দিসা অডিটোরিয়াম, উপজেলার মোড়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে। “কুষ্টিয়া অঞ্চলে তাপ প্রবাহ, উষ্ণায়নের প্রভাব মোকাবিলা ও পরিবেশ বিপর্যয় রোধে করণীয়” শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে নারী উন্নয়ন শক্তি (নাস) ও স্বপ্নশীলন সমাজ উন্নয়ন সংস্থা (এস এস ইউ এস)। এতে সহযোগিতা করে ইয়াং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট রাইটস অ্যান্ড ক্লাইমেট (ওয়াই ডাব্লিউ ডি আর সি) এবং ফোরাম ফর কালচার অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (ফোরাম ফর কালচার এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট)।
বৈঠকে বক্তারা বলেন, কুষ্টিয়া অঞ্চলে তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছে এবং শ্রমজীবী মানুষ, নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি বৃষ্টিপাতের অনিয়ম, খরা, নদীর পানিপ্রবাহ হ্রাস, শিল্প দূষণ এবং সবুজায়নের অভাব পরিবেশ সংকটকে আরও তীব্র করছে।
নারী উন্নয়ন শক্তির নির্বাহী পরিচালক ড. আফরোজা পারভীন বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নারীদের ওপর বেশি পড়ছে। নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে নারীরা বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাই নারী-সংবেদনশীল জলবায়ু নীতি প্রণয়ন জরুরি।” একই সংস্থার প্রকল্প সমন্বয়কারী মাহমুদুল হক বলেন, পরিবেশ অধিকার রক্ষায় আমাদের নিজেদের টাস্ক ফোর্স গঠনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।
স্বপ্নশীলন সমাজ উন্নয়ন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা, লেখক ও গবেষক নাজমুল হুদা বলেন, “গড়াই নদীর নাব্যতা ও পরিবেশ রক্ষা ছাড়া কুষ্টিয়ার টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। নদী দখল ও দূষণ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।” একই সংস্থার নির্বাহী পরিচালক হাফিজ আল আসাদ বলেন, “পরিবেশ বিপর্যয়ের পেছনে পরিকল্পনার অভাব এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা বড় কারণ। স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।”
ফোরাম ফর কালচার অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সুলতান মুহাম্মদ রাজ্জাক বলেন, “পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করে পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।” ইয়াং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট রাইটস অ্যান্ড ক্লাইমেট-এর সদস্য মাহফুজা খাতুন বলেন, “তরুণদের নেতৃত্বে পরিবেশ আন্দোলন জোরদার করতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন আমাদের এলাকায় জনপ্রিয় করতে হবে।”
সরকারের কাছে সংক্ষিপ্ত ও বাস্তবভিত্তিক সুপারিশমালা:
১. কুষ্টিয়ায় জরুরি ভিত্তিতে তাপপ্রবাহ মোকাবিলা কর্মপরিকল্পনা চালু করে তাপপ্রবাহের সময় কাজের সময়সূচি সমন্বয় ও সতর্কতা জারি করা।
২. শহর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ও বাস স্ট্যান্ডে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থান তৈরি করা।
৩. গড়াই নদীর খনন কার্যক্রম জোরদার এবং দূষণ বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা।
৪. শিল্প কারখানায় বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা (ইটীপি) চালু বাধ্যতামূলক করে কঠোর মনিটরিং ও জরিমানা নিশ্চিত করা।
৫. অবৈধ ইটভাটা ও অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনকারী উৎসের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৬. কুষ্টিয়া শহর ও উপজেলায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি জোরদার এবং রাস্তার পাশে সবুজায়ন বৃদ্ধিতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি জোরদার করা।
৭. পৌর এলাকায় নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
৮. কৃষকদের জন্য কম রাসায়নিক ব্যবহার ও পানি সাশ্রয়ী কৃষি পদ্ধতিতে সহায়তা প্রদান ও সচেতন করা।
৯. স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাপপ্রবাহ ও পরিবেশ সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা।
১০. স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে পরিবেশ সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।