দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরে ক্ষতিকর দুই রাসায়নিক—থ্যালেট ও বিসফেনলের প্রভাবও বাড়ছে।
এসব রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে সতর্ক করেছে পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (এসডো)।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক সিচুয়েশন রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্লাস্টিককে নমনীয় ও টেকসই করতে ব্যবহৃত থ্যালেট ও বিসফেনল হরমোনের ভারসাম্য নষ্টকারী রাসায়নিক হিসেবে পরিচিত। এসব উপাদান প্রজনন সমস্যা, শারীরিক বিকাশে ত্রুটি এবং ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
প্রতিবেদনটি ইন্টারন্যাশনাল পলিউট্যান্টস এলিমিনেশন নেটওয়ার্কের (আইপেন) বৈশ্বিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে তৈরি করেছে এসডো। বুধবার রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সংস্থাটির সহকারী কর্মসূচি কর্মকর্তা সাদমীন সাদাফ জাহান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩০ লাখ টনের বেশি প্লাস্টিক উৎপাদিত হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ প্লাস্টিক বাজারের আকার ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং এই খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ২০ শতাংশ।
তবে প্লাস্টিক দূষণের দৃশ্যমান দিক নিয়ে আলোচনা হলেও এর ভেতরে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক নিয়ে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, “প্লাস্টিকের এসব বিষাক্ত উপাদান উপেক্ষা করা খুবই বিপজ্জনক। বিশেষ করে শিশু ও প্রজননক্ষম নারীরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। অথচ এ বিষয়ে দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন বা নীতিমালা নেই।”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিকের পাত্র, শিশুদের খেলনা, স্কুল সরঞ্জাম, থার্মাল পেপার, পিভিসি পণ্য, আঠা ও ছাপার কালিতে থ্যালেট ও বিসফেনলের ব্যবহার রয়েছে।
২০২২ সালে এসডোর এক গবেষণায় দেখা যায়, স্কুলশিশুদের ব্যবহৃত ৪৭টি ইরেজারের মধ্যে ৩০টিতে থ্যালেট পাওয়া গেছে। একই বছরে ঢাকার বিভিন্ন দোকান থেকে সংগ্রহ করা ৩৯টি থার্মাল পেপারের রসিদের মধ্যে ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশে বিপিএর উপস্থিতি শনাক্ত হয়।
এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩ সালের এক গবেষণার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, সাভার ও টঙ্গীর মতো শিল্পাঞ্চলে থ্যালেটের উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করছে।
এসডোর মহাসচিব শাহরিয়ার হোসেন বলেন, “প্লাস্টিক শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও ক্ষতিকর রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এটি শ্রমিক, পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠবে।”
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক তাহমিনা শিরিন বলেন, রাসায়নিকযুক্ত খাবার দেশে অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তিনি গবেষণার তথ্য নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।
প্রতিবেদনে থ্যালেট ও বিসফেনলের ব্যবহার সীমিত করতে দ্রুত নীতিমালা প্রণয়ন, রাসায়নিকভিত্তিক প্রবিধান তৈরি এবং পণ্যের মোড়কে এ-সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে।