প্রতি বছর পানি বৃদ্ধি ও হ্রাসের সময় তিস্তা নদীতে তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। চলতি বছরেও ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী হাজারো পরিবার।
নদী ভাঙনের ফলে ইতিমধ্যে শতাধিক ঘরবাড়ি ও বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আবার অনেকে বসেছে পথে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগে, অর্থাৎ শুষ্ক মৌসুমেই ঝুঁকিপূর্ণ ডান তীর রক্ষা বাঁধ দ্রুত সংস্কার কাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
এ প্রেক্ষাপটে তিস্তা নদীর ডান তীর রক্ষা বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী এবং ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান। বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকাল চারটার পর থেকে কয়েক ঘণ্টা পায়ে হেঁটে তারা বাঁধের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন।
পরিদর্শনকালে তারা উপজেলার কালিগঞ্জ ঝড়সিংহেশ্বর এলাকার নদীপাড়ের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের দুর্ভোগের চিত্র সরেজমিনে তুলে ধরেন। কালিগঞ্জ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা লোকমান হোসেন বলেন, “তিস্তার পানি বাড়তে শুরু করলেই বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। সব সময় আতঙ্কে থাকি, কখন আবার ঘরবাড়ি আর জমিজমা নদীতে ভেসে যায়।”
স্থানীয় গৃহবধূ শাহিদা বেগম বলেন, “বছরের পর বছর ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করছি। কষ্ট করে ঘর তুলি, আবার নদী সব কেড়ে নেয়। এখন নতুন করে কিছু গড়ার সাহসও পাই না।” ঝড়সিংহেশ্বর এলাকার কৃষক আব্দুল করিম বলেন, “আমার জীবিকার একমাত্র ভরসা ছিল জমি। নদী ইতোমধ্যে অনেকটা নিয়ে গেছে। এবার যদি বাঁধটা ঠিক না করা হয়, তাহলে বাকি যা আছে, তাও রক্ষা করা যাবে না।”
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ডালিয়া পাউবোর অধীন তিস্তা নদীর ডান তীর রক্ষা বাঁধটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাঁধটির বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানিতে মাটি ধসে পড়েছে। কোথাও ইঁদুরের গর্ত, আবার কোথাও বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য গাইড বাঁধ কেটে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে, যা বাঁধটিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বিশেষ করে কালিগঞ্জ ঝড়সিংহেশ্বর এলাকায় বাঁধের শূন্য মিটার থেকে ১ হাজার ২৫০ মিটার অংশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবরের ভয়াবহ বন্যায় এই অংশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সেই সময় পাউবো কর্তৃপক্ষ, উপজেলা প্রশাসন, বিজিবি সদস্যগণ ও স্থানীয় সর্বসাধারণের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বাঁধটি সেই সময় রক্ষা পায়। কিন্তু ক্ষতের চিহ্ন এখনো রয়ে গেছে!
এ বাঁধের ওপর ও আশপাশে রয়েছে বিজিবির কালিগঞ্জ বিওপি ক্যাম্প, কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নবনির্মিত ঝাড়সিংশ্বর বিওপি ক্যাম্প, থানার হাট বিওপি ক্যাম্প এবং বার্নির ঘাট বিওপি ক্যাম্প। পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি, দোকানপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়। ফলে বাঁধটির যেকোনো ক্ষতি হলে ব্যাপক জনদুর্ভোগের আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে হাজারো পরিবার।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, “ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, “তিস্তা নদীর ডান তীর রক্ষা বাঁধটি দ্রুত সংস্কারের লক্ষ্যে প্রায় ৮৫ লাখ টাকার একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ অনুমোদন পেলেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জরুরি মেরামত কাজ শুরু করা হবে, যাতে বর্ষা শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো সংস্কার করা যায়।”
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না, ডালিয়া পাউবোর সহকারী প্রকৌশলী সোহেল রানা, শাখা কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম এবং কালিগঞ্জ বিওপি ক্যাম্প কমান্ডার সুবেদার আইয়ুব আলীসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সাংবাদিকবৃন্দ।
এলাকাবাসীর দাবি, শুষ্ক মৌসুমে দ্রুত সংস্কার কাজ শুরু না হলে বর্ষায় আবারও ভাঙনের কবলে পড়বে পুরো এলাকা। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।