সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর জনপদ এখন পরিণত হয়েছে শোকের উপত্যকায়।
একদিকে আকাশ থেকে নেমে আসা বজ্রপাতের মরণঘাতী ছোবল, অন্যদিকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের সারা বছরের অন্ন জোগানোর একমাত্র সম্বল বোরো ধান। প্রকৃতি ও পরিস্থিতির নিষ্ঠুরতায় দিশেহারা হাওরবাসী এখন এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে।
বছরের পর বছর বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও তা রোধে সরকারি উদ্যোগগুলো যেন কেবলই লোক দেখানো। সরকারি নথিতে বজ্রপাত প্রতিরোধে ২০১৮ সালে এক লাখ এবং ২০২৪ সালে আরও দুই হাজার তালগাছ রোপণের তথ্য থাকলেও, বাস্তবে হাওরজুড়ে সেগুলোর কোনো চিহ্ন নেই। সঠিক পরিচর্যার অভাবে চারাগুলো অঙ্কুরেই মরে গেছে।
একই দশা কোটি টাকা ব্যয়ে বসানো বজ্রনিরোধক দণ্ডের। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৮টি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হলেও তা হাওরবাসীর কোনো কাজে আসছে না। গত পাঁচ বছরে জেলায় বজ্রাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭২ জন। জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ পুনর্বাসন শাখার তথ্যমতে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্তই অকালে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন। জীবনঝুঁকি নিয়েই বোরো মৌসুমে মাঠে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষক ও জেলেরা।
জেলা প্রশাসক মিনহাজুর রহমান জানিয়েছেন, তালগাছ রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে তদন্তের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দোহাই দিয়ে আর কত লাশ পড়বে? দ্রুত আধুনিক ও কার্যকর প্রযুক্তির ব্যবস্থা করাই এখন সময়ের দাবি।
প্রকৃতির চরম বৈরিতার পাশাপাশি মানুষের তৈরি অব্যবস্থাপনা কৃষকের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। গত সোম ও মঙ্গলবার রেকর্ড ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরসহ বিভিন্ন স্থানে বুক সমান পানিতে তলিয়ে গেছে আধপাকা ধান। মাঠের অর্ধেক ধান এখনো অবিন্যস্ত, শ্রমিক সংকট ও বৈরী আবহাওয়ায় হারভেস্টার মেশিনও অকেজো হয়ে পড়ায় অসহায় কৃষক নিজের চোখের সামনেই দেখছেন স্বপ্নের মৃত্যু।
ফসল তলিয়ে যাওয়ার পেছনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দায়িত্বহীনতা ও সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা। অনেকগুলো বাঁধ প্রকল্পের আওতাভুক্ত নয় বলে দায় সারছে পাউবো, অথচ স্থানীয় পর্যায়ে নির্মিত বাঁধগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের নজরদারি ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। করচার হাওরের হরিমণের বাঁধের অসমাপ্ত কাজ যেন এই অব্যবস্থাপনারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৩৭টি হাওরের অর্ধেকের বেশি জমির ধান এখনো কাটা বাকি। আগামী দুদিন অতিবৃষ্টির পূর্বাভাস কৃষকদের জন্য যেন এক অশনিসংকেত। হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, কৃষকের এই দুর্দশা কেবল প্রাকৃতিক নয়, এটি মূলত প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার ফসল।
সুনামগঞ্জের হাওরের হাজারো পরিবারের কাছে এই ধান কেবল একটি ফসল নয়, এটি আগামী এক বছরের বেঁচে থাকার রসদ। প্রকৃতির রোষ এবং সরকারি উদ্যোগের ব্যর্থতায় আজ কৃষকের দীর্ঘশ্বাসে সিক্ত হাওর। শেষ পর্যন্ত কি এই ফসল রক্ষা পাবে, নাকি প্রকৃতি ও প্রশাসনের অবহেলায় আরও এক বছর হাহাকারে কাটবে হাওরপাড়ের জনপদ সেই প্রশ্নই এখন সর্বত্র।