হুমায়ুন কবির বাবু :
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিবিধখাতের বহুজাতিক কোম্পানি বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের আর্থিক প্রতিবেদনে পণ্য বিক্রিতে ২৬০ কোটি টাকার নয়ছয় তথ্য পাওয়া গেছে। কোম্পানিটির ২০১৯-২০ অর্থবছরে পণ্য বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৬৩২ কোটি টাকা কিন্তু কোম্পানি বলছে ১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। যা ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাব প্রতিবেদনে এসে ২০২০ অর্থবছরে হিসাবে পণ্য এ তথ্য উঠে এসেছে। একইসঙ্গে ২০২০ ও ২০২১ অর্থবছরের দুই অর্ধবার্ষিকী হিসাব প্রতিবেদনেও ৯১ কোটি ৭৮ কোটি উধাওয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।
কোম্পানির ২০২০ ও ২০২১ সমাপ্ত অর্থবছরের হিসাব প্রতিবেদন ঘেঁটে জানা গেছে, ৩১ মার্চ’ ২০২০ অর্থবছরে হিসাব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কোম্পানি পণ্য বিক্রি করেছে ১ হাজার ৮৯২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। আর বিক্রি খরচ হয়েছে ৯৯০ কোটি ৯০ লাখ টাকা, বিক্রি পরিবেশন এবং গোডাউন ভাড়া ব্যয় হয়েছে ৫৩৫ কোটি টাকা, অন্যান্য পরিচালন আয় হয়েছে ২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা, সুদজনিত ব্যয়, কর ব্যয় বাদ দিয়ে বছরটিতে নিট মুনাফা হয় ২৪২ কোটি ২০ লাখ টাকা বা ইপিএস ৫২.২২ টাকা। কিন্তু ২০২০-২১ সমাপ্ত অর্থবছরে এসে কোম্পানি বলছে, ২০২০ অর্থবছরে কোম্পানির পণ্য বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬৩২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। আর বিক্রির ব্যয় হয়েছে ৯৯০ কোটি ৬২ লাখ টাকা, বিক্রি পরিবেশন এবং গোডাউন ভাড়া ব্যয় হয়েছে ২৭৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা, অন্যান্য পরিচালন আয় হয়েছে ২০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, সুদজনিত ব্যয়, কর ব্যয় বাদ দিয়ে নিট মুনাফা এখানেও দেখানো হয়েছে ২৪২ কোটি ২০ লাখ টাকা বা ইপিএস ৫২.২২ টাকা। অর্থাৎ কোম্পানিটি বছরটিতে পণ্য বিক্রিসহ অন্যান্য ব্যয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। এদিকে ২০২০-২১ অর্থবছরে কোম্পানির পণ্য বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা। বছরটিতে বিক্রি থেকে যাবতীয় ব্যয় বাদ দিয়ে নিট মুনাফা হয়েছে ২৬৯ কোটি টাকা বা ইপিএস ৫৮.০৩ টাকা! আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পণ্য বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। বছরটি থেকে বিক্রি খরচ, বিক্রি পরিবেশন এবং গোডাউন ভাড়া ব্যয়, সুদজনিত ব্যয়, কর ব্যয় বাদ দিয়ে নিট মুনাফা হয় ২০৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বা ইপিএস ৪৪.২৭ টাকা।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেখানে কোম্পানির পণ্য বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা আর নিট মুনাফা হয়েছে ২০৫ কোটি টাকা বা ইপিএস হয়েছে ৪৪.১৩ টাকা। সেখানে দেশে করোনাকালিন বছরের শুরু থেকেই লকডাউনসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে ২০২০ অর্থবছরজুড়ে কোম্পানির পণ্য বিক্রি কীভাবে ১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা হয়। বিষয়টি নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মার্চেন্ট ব্যাংক ও স্টক এক্সচেঞ্জের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কোম্পানির ২০২০ অর্থবছরে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা আর যাবতীয় ব্যয় বাদ দিয়ে মুনাফা হয়েছে ২৪২ কোটি ২০ লাখ টাকা বা ইপিএস ৫২.২২ টাকা। আর ২০২১ অর্থবছরে পণ্য বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা আর যাবতীয় ব্যয় বাদ দিয়ে মুনাফা হলো ২৬৯ কোটি টাকা বা ইপিএস ৫৮.০৩ টাকা! কোম্পানির এ ধরনের হিসাব প্রতিবেদনে যে মানের ভিত্তি করে হিসাব করা হয়েছে সে সম্পর্কে শেয়ারবাজারে সাধারন বিনিয়োগকারীরা কতটা জানে বা বুঝে সেটি পরিষ্কার করতে সংশ্লিষ্ট প্রধান রেগুরেটেড প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মাধ্যমে খতিয়ে দেখে বিনিয়োগকারীদের ব্যাখ্যার মাধ্যমে জানানো উচিত বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে কোম্পানির প্রথম প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন’১৯) পণ্য বিক্রি হয়েছে ৪৫৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। আর যাবতীয় ব্যয় বাদ দিয়ে নিট মুনাফা দাঁড়ায় ৫১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর’ ১৯) বিক্রি হয়েছে ৩৬৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা আর সব ব্যয় বাদ দিয়ে মুনাফা দাঁড়ায় ৪৪ কোটি টাকা ব্ াশেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ৯.৪৯ টাকা। দুই প্রান্তিকে অর্থাৎ ৬ মাসে কোম্পানির বিক্রি দাঁড়ায় ৮২১ কোটি ১৩ লাখ টাকা। কিন্তু কোম্পানি বলছে ৭৫৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। আর হিসাবে কোম্পানি নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে ৯৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বা ইপিএস ২০.৬১ টাকা। অর্থাৎ দুই প্রান্তিক মিলে বিক্রি কম দেখানো হয়েছে ৬৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা। আর তৃতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর’ ১৯) বিক্রি হয়েছে ৪৬৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ৯ মাসে (এপ্রিল-ডিসেম্বর’১৯) বিক্রি দাঁড়ায় এক হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। কিন্তু কোম্পানি বলছে এক হাজার ২২১ কোটি টাকা।
অপরদিকে ২০২০-২১ অর্থবছরের (এপ্রিল-জুন’২০) প্রথম প্রান্তিকে পণ্য বিক্রি হয়েছে ২৩২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। যাবতীয় ব্যয় বা খরচ বাদ দিয়ে নিট মুনাফা দাঁড়ায় ১০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বা ইপিএস ২.৩২ টাকা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর’২০) পণ্য বিক্রি হয়েছে ৪০৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। আর নিট মুনাফা হয়েছে ৬৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা বা ইপিএস ১৪.২৬ টাকা। হিসাবে দুই প্রান্তিক মিলে (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর’২০) ৬ মাসে কোম্পানির পণ্য বিক্রি হয়েছে ৬৩৮ কোটি টাকা। কিন্তু বার্জার কর্তৃপক্ষ বলছে ৬১৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৬ মাসের হিসাব (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) থেকে বিক্রি ২৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা কম দেখানো হয়েছে। তবে প্রকাশিত দুই প্রান্তিকের ইপিএস ১৬.৫৮ টাকা ঠিক রাখা হয়েছে বা কোন হেরফের হয়নি। তৃতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর’২০) বিক্রি হয়েছে ৫১৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। প্রান্তিকটিতে যাবতীয় ব্যয় বাদ দিয়ে মুনাফা দাঁড়ায় ৯০ কোটি ১৯ লাখ টাকা বা ইপিএস ১৯.৪৫ টাকা। আর ৯ মাসে (এপ্রিল-ডিসেম্বর’২০) কোম্পানির মোট বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। আর যাবতীয় ব্যয় বাদ দিয়ে নিট মুনাফা হয় ১৬৭ কোটি ৮ লাখ টাকা বা ইপিএস ৩৬.০৩ টাকা। আর ২০২১-২২ অর্থবছরের ৯ মাসে (এপ্রিল-ডিসেম্বর’২১) বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬০৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এতে যাবতীয় ব্যয় বাদ দিয়ে নিট মুনাফা দাঁড়ায় ২০০ কোটি ২৪ লাখ টাকা বা ইপিএস ৪৩.১১ টাকা।
কোম্পানির ২০২০ অর্থবছরের হিসাবে পণ্য বিক্রিতে ২৬০ কোটি টাকা নয়ছয় এবং ২০২০ ও ২০২১ অর্থবছরের অর্ধবার্ষিকী প্রতিবেদনে প্রকৃত পণ্য বিক্রি টাকা থেকে ৯১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা পণ্য বিক্রির সাথে গড়মিল বিষয়ে ব্যাখা জানতে চাইলে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের সেক্রেটারি আবু জাফর সিদ্দিক ঢাকা প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে যেভাবে হিসাব দেখানো হয়েছে সেগুলো মূলত ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স রিপোর্টিং স্টান্ডার্ড (আইএফআরএস-১৫) মান অনুযায়ি দেখানো হয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সেচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে গত বছর মার্চ ও এপ্রিল মাসে কোম্পানির প্রথম প্রান্তিকে বিক্রি ছিল ২৩২ কোটি টাকা আর দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৪০৫ কোটি অর্থাৎ ৬ মাসের হিসাবে পণ্য বিক্রির তথ্য দওয়া হয়েছিল ৬১৩ কোটি টাকা, কিন্তু হওয়ার প্রয়োজন ছিল ৬৩৭ কোটি টাকা। যা লাল কালিতে ঝুঁলছিল। পরে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করলে হিসাবে এ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন ও উধাওয়ের চিত্র বেরিয়ে আসে। এমন প্রশ্নে কোম্পানিটির সাথে সংশ্লিষ্ট এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তাএ প্রতিবেদককে বলেন, ডিএসইর টেকনোলজি সফটওয়্যার অত্যন্ত দূর্বল ও নিম্নমানের বলে এভাবে সংকেত তুলে ধরেছে।