স্পেসিফিকেশন টেম্পারিং থার্মো ফিশার নামক বিদেশী কোম্পানির প্রতিনিধির সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে মিথ্যা তথ্য প্রদান বিপুল পরিমান অর্থ লেনদেন ল্যাব টেস্টে ভূল ফলাফলের আশঙ্কা ইজিপি টেন্ডার আইডি- ১২৩২৫৯৯ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার ফরেনসিক ল্যাবে রাসায়নিক শনাক্তকরণ যন্ত্র কেনাকাটায় ব্যাপক জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইজিপি’র মাধ্যমে ওপেন টেন্ডার মেথড পদ্ধতিতে এই কেনাকাটার দরপত্র আহবান করা হয়।
টেন্ডার নোটিশ প্রকাশিত হয়েছিল এ বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি। বিভিন্ন রকম নথি জালিয়াতির মধ্য দিয়ে গত সপ্তাহে থার্মো ফিশার নামক কোম্পনির তৈরি যন্ত্রটি সরবরাহের জন্য হাই টেক ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজিস লিমিটেড নামক একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে নোয়া দেয়া হয়। তবে বাংলাদেশে সরকারি টেন্ডার (দরপত্র) জালিয়াতি, টেম্পারিং বা কারচুপি করা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এর জন্য প্রধানত পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ (পিপিএ ২০০৬), পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮ (পিপিআর ২০০৮), এবং দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কক্সবাজার ডিএনসি ল্যাবে জিসি-এমএস সিস্টেম কেনার জন্য দরপত্র আহবান করে। এই অত্যাধুনিক যন্ত্র দিয়ে ফরেনসিক ল্যাবে রাসায়নিক শনাক্ত করা হয়। প্রত্যেকটি জিনিসে রাসায়নিক উপাদান নির্দিষ্ট মাত্রায় বিরাজমান থাকে। এই উপাদান সঠিক মাত্রায় শনাক্ত করাই এই যন্ত্রের কাজ। আর এই মাপকাঠির জন্য রয়েছে যন্ত্রের রেঞ্জ। থার্মো ফিশারের মূল ক্যাটালগে মাস রেঞ্জ রয়েছে ১.২-১,১০০ যা টেম্পারিং করে করা হয়েছে ১.১-১,১০০। আপাতদৃষ্টিতে মাত্র .১ টেম্পারিং দেখা গেলেও ফলাফল নির্ধারণে এতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। এতে করে একদিকে প্রকৃত দোষী শনাক্তে যেমন ব্যাঘাত ঘটতে পারে অপরদিকে নিরপরাধ ব্যক্তি ফেঁসে যেতে পারেন।
দরপত্রে অনুরুপ যন্ত্র বাংলাদেশে কোথায় কোথায় ব্যবহার করা হচ্ছে এমন একটি শর্ত ছিল। চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি রিজিয়ন্যাল ম্যানেজার, থার্মো ফিশার ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড এর পক্ষে অভিষেক মুখার্জি স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে ৫ টি প্রতিষ্ঠানে এই যন্ত্র ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি, সিআইডি, রেনেটা ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি এবং রিভার রিসার্স ইনস্টিটিউট। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রিভার রিসার্স ইনস্টিটিউটে এ ধরনের কোনো যন্ত্র নাই। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি এবং সিআইডিতে ভিন্ন মডেলের (টিএসকিউ ৯০০০) যন্ত্র রয়েছে। শধুমাত্র রেনেটা ফার্মাসিউটিক্যালসে এই যন্ত্রটি ব্যবহার হচ্ছে।
এই ধরনের অনিয়ম, দূর্নীতি বা টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি যৌথভাবে দুর্নীতি ও জালিয়াতি করে, তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে মামলা হবে। এর আওতায় সরকারি তহবিল আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
এছাড়া দরপত্রে চাহিদা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রোডাক্ট স্পেসিফিকেশন হিসেবে যে ক্যাটালগ সরবরাহ করা হয়েছে তাতে মূল ক্যাটলগে নাই এমন অনেক বিষয়াদি যুক্ত করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, নথিপত্রে এতো অনিয়মের পরও কি প্রক্রিয়ায় বা কত লাভে নথিপত্র যাচাই-বাছাই না করে এমন একটা স্পর্শকাতর সেক্টরের জন্য যন্ত্র কেনা হচ্ছে। তবে ডিজিটাল টেন্ডার (ই-জিপি) জালিয়াতি বর্তমানে অধিকাংশ টেন্ডার ই-জিপি পোর্টালে হয়। ই-জিপি সিস্টেমে টেম্পারিং বা ভুয়া আইডি ব্যবহার করলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (বর্তমানে সাইবার নিরাপত্তা আইন) অনুযায়ীও মামলা হতে পারে, যার শাস্তি অনেক বেশি।
এসব অনিয়ম দূর্নীতি বিষয়ে জানতে ডিএনসি’র উপ-পরিচালক (ক্রয়, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আপনার কাছে যা আছে তাই দিয়ে লিখেদেন, আমার এখানে কোনো প্রকার অনিয়ম দূর্নীতি হয়নি।
তবে ঢাকা প্রতিদিনের হাতে টেম্পারিং করা এবং টেন্ডার জালিয়াতির সব প্রমাণ পত্র আছে, কিন্তু উনি তা অস্বীকার করেন। তবে ল্যাব টেস্টের যন্ত্রের স্পেসিফিকেশনে কোনোরকম ব্যতয় হলে তা ফলাফলে প্রভাব পড়বে যা অত্যন্ত বিপদজনক। এছাড়া দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সরকারি প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে এরকম জালিয়াতির আশ্রয় নেয় তবে বিদেশী ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো আস্থা সংকটে পড়বে।