দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক–এর গাজীপুরের শ্রীপুর অংশে এমসি বাজার ও নয়নপুরের মাঝামাঝি এলাকায় দাঁড়ালে প্রথমেই চোখে পড়ে এক অস্বস্তিকর দৃশ্য।
যেখানে থাকার কথা গতির ছন্দ, সেখানে এখন স্তূপাকার বর্জ্য। মহাসড়কের বুক চিরে ছুটে চলা যানবাহনের পাশেই গড়ে উঠেছে ময়লার পাহাড়—নীরবে, ধীরে, কিন্তু দৃশ্যত স্থায়ী হয়ে ওঠার ইঙ্গিত নিয়ে।
ময়মনসিংহগামী লেনের কয়েকশ মিটারজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বর্জ্যে সড়কের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঢেকে গেছে। কোথাও কোথাও ময়লা জমে ছোট টিলার মতো উঁচু হয়েছে; তার গায়ে জন্মেছে সবুজ ঘাস। দৃশ্যটি যেন দীর্ঘদিনের অবহেলার ওপর প্রকৃতির ব্যঙ্গাত্মক স্বাক্ষর—সময় বলছে, এই স্তুপ একদিনে তৈরি হয়নি।
সড়কের গতি কমছে, বাড়ছে ঝুঁকি
স্থানীয়দের ভাষ্য, অন্তত এক বছর ধরে ট্রাক ও ভ্যানে করে এখানে নিয়মিত বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। শুরুতে সড়কের কিনারে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে তা মূল লেনের দিকে এগিয়েছে। এখন গাড়ি চালকদের ময়লার স্তূপ এড়িয়ে গতি কমিয়ে চলতে হয়। ভারী যানবাহন একে অন্যকে পাশ কাটাতে গিয়ে ঝুঁকি নিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
পরিবহনচালক জব্বার বলেন, “রাতে এই অংশে গাড়ি চালাতে ভয় লাগে। অন্ধকারে ময়লার স্তুপ বোঝা যায় না। সামান্য ভুল হলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে সড়কের স্বাভাবিক প্রস্থ আরও কমে যাবে। ব্যস্ত মহাসড়কে এমন চিত্র ভবিষ্যতে বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
দুর্গন্ধে ভারী বাতাস, ধোঁয়ায় ঢাকে আকাশ
দিনে দুর্গন্ধ, রাতে ধোঁয়া—দুই চাপে পড়েছেন আশপাশের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। এমসি বাজারের ব্যবসায়ী আতিকুল রহমান বলেন, “আগুন দিলে কালো ধোঁয়া উড়ে পুরো এলাকা ঢেকে যায়। অনেক সময় দোকান আগেভাগে বন্ধ করতে হয়।”
নয়নপুর এলাকার বাসিন্দা ফজলুল হক বলেন, “বাচ্চারা কাশি নিয়ে ভুগছে। জানালা খুলে রাখা যায় না। বাতাসে সব সময় একটা অস্বস্তি।
রাতের আঁধারে ময়লায় আগুন দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ বাড়ছে। পোড়া প্লাস্টিকের ধোঁয়া শুধু চোখ জ্বালাপোড়া নয়, দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি করছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্যসচেতন বাসিন্দারা।
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা নদী পরিব্রাজক দল শ্রীপুর শাখার সভাপতি সাঈদ চৌধুরী বলেন, “উন্মুক্ত স্থানে মিশ্র বর্জ্য ফেলা ও পোড়ানো পরিবেশের জন্য মারাত্মক ও আইনত দন্ডনীয় । এতে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানির সঙ্গে ময়লার তরল পদার্থ মাটিতে মিশে ভূগর্ভস্থ পানিকেও দূষিত করতে পারে। বর্জ্যের ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা জায়গা প্রয়োজন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এভাবে চলতে থাকলে এলাকাটি অনিয়ন্ত্রিত ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পরিণত হবে। তখন ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, একসময় মহাসড়কের পাশের খোলা জমিতে পাখির কলকাকলি শোনা যেত। এখন সেখানে উড়ে বেড়ায় প্লাস্টিকের টুকরো, ভাসে দুর্গন্ধ।
অবকাঠামোও ঝুঁকিতে
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ভারী বর্জ্য সড়কের ওপর পড়ে থাকলে বিটুমিন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পচা বর্জ্যের পানি সড়কের ভেতরে ঢুকে গর্ত সৃষ্টি করতে পারে। এতে ভবিষ্যতে সংস্কার ব্যয় বাড়বে, ভোগান্তিও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কে.এম শরিফুল আলমকে সরকারি নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ব্যারিস্টার সজীব আহমেদ বলেন, “কারা বা কোন উৎস থেকে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে তা চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেহেতু ময়লা মহাসড়কের জায়গায় ফেলা হচ্ছে, হাইওয়ে পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে হবে। পৌর শহরের বর্জ্যের জন্য ডাম্পিং ব্যবস্থা রয়েছে। উপজেলার জন্যও সরকারি জায়গা খোঁজা হচ্ছে। জায়গা পেলেই নীতিমালার আওতায় ডাম্পিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে।
মাওনা হাইওয়ে থানার ওসি মো. কামরুজ্জামান বলেন, “মহাসড়কে ময়লা ফেলার বিষয়টি আমরা জানি না। যারা এ কাজে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। অনেক সময় রাতের আঁধারে তারা ময়লা ফেলে। খুব দ্রুত এই চক্রটিকে ধরতে সক্ষম হব।
গাজীপুর জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরেফিন বাদল বলেন, “বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় পড়ে। আমরা চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে ময়লা অপসারণের ব্যবস্থা নিতে বলব। প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
তাৎক্ষণিকভাবে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। নির্দিষ্ট ডাম্পিং ব্যবস্থা, নিয়মিত নজরদারি, সিসিটিভি স্থাপন ও জনসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এ সমস্যা সমাধান কঠিন।
শ্রীপুরবাসীর প্রশ্ন—দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের বুকেই যদি এমন দৃশ্য স্থায়ী রূপ নিতে শুরু করে, তবে পরিবেশ সুরক্ষার অঙ্গীকার কতটা কার্যকর?
ময়লার এই পাহাড় তাই শুধু দৃষ্টিকটু দৃশ্য নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও প্রশাসনিক জবাবদিহির সামনে এক কঠিন পরীক্ষা। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্টরা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সড়কের স্বাভাবিক চেহারা ফিরিয়ে আনেন, নাকি নীরব এই বিপর্যয় আরও বিস্তৃত হয়ে ভবিষ্যতের জন্য বড় সংকেত রেখে।